কর্মমুখী শিক্ষা আত্মনির্ভরশীলতার হাতিয়ার
মিশকাতুল ইসলাম মুমু : শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদন্ড, আর সেই মেরুদন্ড তিলে তিলে ক্ষয় করছে সার্টিফিকেটীয় শিক্ষা। একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মেধা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মকে গড়ে তোলা। বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে কিন্তু সেই হারে মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ফলে বেকারত্ব, আত্মহত্যা, দরিদ্র্যতাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমাদের শিক্ষা এখনও অনেকটা পরাধীন যুগের। এখনও ব্রিটিশদের কেরানী বানানোর শিক্ষাব্যবস্থা দেশে প্রচলিত। প্রচলিত গ্রন্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রিধারী শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরি করছে বটে; কিন্তু তা কর্মভিত্তিক না হওয়ায় ফলপ্রসূ হয়ে উঠছে না। ফলস্বরূপ দেশ আজ ধীরে ধীরে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে।
এ অবস্থা পরিবর্তনে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা। কর্মমুখী শিক্ষা মূলত এমন একধরনের শিক্ষা যা শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ দেয় এবং বাস্তব জীবনে উপার্জনক্ষম করে তোলে। এটি প্রযুক্তি, ব্যবসা, কৃষি, শিল্প, কারিগরি, স্বাস্থ্যসেবা, হস্তশিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করে। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র তত্ত্বগত বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলা নয়, বরং তাকে বাস্তব জগতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযুক্ত করে তোলা। সাধারণ শিক্ষার অনিশ্চিতার পরিপ্রেক্ষিতে বৃত্তিমূলক বা কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব বেড়েছে।
বর্তমানে জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থানের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে নিরাশা, হতাশাগ্রস্ত হয়ে মানুষ আত্মাহত্যা করছে। এই বেকারত্বের কারণে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রতিযোগীর কর্মমুখী শিক্ষা আত্মনির্ভরশীলতার হাতিয়ার পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও যখন জীবনে সফল হতে পারছে না। তখন নিজেই হেরে যাচ্ছে জীবনের কাছে, এভাবে খালি হয়ে যাচ্ছে হাজারও মায়ের বুক, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে হাজারও পরিবার। ঠিক এ কারণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বহুবিধ। এ শিক্ষা গ্রহণের পর একজন শিক্ষার্থীকে চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দারিদ্র্যবিমোচনে এ শিক্ষা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ শিক্ষা নতুন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয়। আছে সুস্থ-সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের অঙ্গীকার। কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তাই কর্মমুখী শিক্ষা আরও ব্যাপক হওয়া প্রয়োজন। কর্মমুখী শিক্ষার ওপর যত বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তত সুদৃঢ় হবে। তাই আমাদের উচিত এ শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা। এ শিক্ষার মধ্য দিয়েই দেশের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন সম্ভব।
বিভিন্ন ঘরে যে হতাশা আর দুঃখ দারিদ্র্যের চিত্র, এ শিক্ষা সেখানে দূর করবে তার দুঃখ-রজনীর হতাশা আর অন্ধকার। আবার উচ্চারিত হবে জীবনের জয়গান। উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্রে হ্রাস পাবে শক্তির অবাঞ্ছিত অপচয়। এ দেশবাসী আবার ফিরে পাবে তার হারানো সমৃদ্ধ অতীত। কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক ও বাস্তব রূপায়ণের মধ্য দিয়েই এ দেশ হবে স্বনির্ভর। কর্মমুখী শিক্ষার মধ্যেই আছে সেই পথনির্দেশ। বর্তমানে আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষা একেবারে সম্প্রসারিত হয়নি তা নয়। স্বাধীনতা অর্থবহ করে তুলতে হলে কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে আশাব্যঞ্জক এই যে, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কারিগরি, বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশে প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল, লেদার, সিরামিক, পাট, টেকনিক্যাল কলেজ, গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউট রয়েছে। তবে প্রয়োজনের তলনায় একেবারেই কম। বস্ত্র শিল্প, জাহাজ শিল্প, চিনিকল, ইস্পাত ইত্যাদি শিল্পের দক্ষ কারিগর সৃষ্টির জন্য সহায়ক কর্মমুখী শিক্ষার দরকার রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও ভোকেশনাল ধরনের কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে, তবে এর প্রসার এখনো খুবই সীমিত। ফলে প্রচলিত ধারার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন করেও লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বেকার থেকে যাচ্ছে। কর্মমুখী বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা বলতে বোঝায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারিক শিক্ষা, যেমন কৃষিকাজ, দর্জির কাজ, বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামত, গাড়ি চালনা, হাঁস-মুরগি বা গবাদি পশু পালন, সেলুন বা প্রাথমিক চিকিৎসার মতো বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ। এ ধরনের শিক্ষা অল্প খরচে, অল্প সময়ে অর্জন করা সম্ভব এবং তাৎক্ষণিকভাবে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।
আরও পড়ুনবিশ্বের উন্নত ও দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভূতপূর্ব অগ্রগতির পেছনে এই শিক্ষার বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও কর্মমুখী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে ভারতের প্রায় ৫% শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এই শিক্ষায় প্রশিক্ষিত, আর বাংলাদেশে তা ১% এরও কম। এর কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কর্মমুখী শিক্ষা উপেক্ষিত। এমনকি সাম্প্রতিককালে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অনেক কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণের পরও কর্মমুখী শিক্ষার দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য।
বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট। তাই শিক্ষাকে এখনই জীবনমুখী করে তোলার প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রি প্রদান করলেও কর্মমুখী না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। কর্মমুখী শিক্ষা একজন ব্যক্তিকে আত্মনির্ভরশীল করে এবং জাতির উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করে। তবে এর বাস্তবায়নে অবকাঠামো, প্রশিক্ষক, উপকরণ ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাই পারে তরুণদের সক্ষম করে গড়ে তুলতে, যারা ভবিষ্যতে হবে আত্মনির্ভর বাংলাদেশের নির্মাতা। পরিশেষে বলতে চাই, দক্ষ মানুষ তৈরি করাই হোক আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
mishkatislam102@gmail.com
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1787981127.jpg)
_medium_1787723104.jpg)
_medium_1787549411.jpg)
_medium_1787548880.jpg)
_medium_1787460863.jpg)
_medium_1787379762.jpg)
_medium_1788069659.jpg)
_medium_1788068554.jpg)
