উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে প্রয়োজন গবেষণালব্ধ পরিকল্পনা
নজিবর রহমান জিয়া : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক উন্নয়ন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জনগণের ধারণা ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার নির্বাচিত হবে বিধায় দেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। দেশ স্বাধীনের প্রায় ৫৫ বছর অতিবাহিত হলেও দেশের উত্তরবঙ্গে সুষম উন্নয়ন হয়নি বরং পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের চেয়ে উত্তরবঙ্গ অনেক পিছিয়ে আছে। উত্তরবঙ্গের কৃষকবৃন্দ একমাত্র উত্তরবঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে খাদ্যশস্যে উৎপাদনে দেশের শীর্ষ জেলাগুলো উত্তরবঙ্গে অবস্থিত। এখানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য উত্তরবঙ্গের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য সারা বাংলাদেশেই সাপ্লাই দেয়া হয়।
অথচ উত্তরবঙ্গের জনগণ উন্নয়নবঞ্চিত। উত্তরবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া স্টেডিয়াম নেই। বগুড়ার শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামে প্রায় ২০ বছর পূর্বে আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় না। উত্তরবঙ্গে শিক্ষিতের হার আশাব্যঞ্জক। শিক্ষার প্রতি অভিভাবকবৃন্দের বিশেষ দূর্বলতা আছে। উত্তরবঙ্গে ভূমি বিশেষ উর্বর হওয়ায় বছরে ০৩টি ফসল হয়। এই অঞ্চলের জনগণের কৃষি ছাড়া তেমন কোন আয়ের উৎস নাই বললেই চলে। ফলে দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের লেখাপড়া করানোর প্রতি বিশেষ যত্নশীল।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে হারে উত্তরবঙ্গের শিক্ষিত জনগণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু সে হারে উত্তরবঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব প্রদান না করা হলে উত্তরবঙ্গবাসীর বা জনগণের ভাগ্য আরও বিপর্যয় নেমে আসবে। কারণ শুধু উত্তরবঙ্গে নয় সারা বাংলাদেশেই যেভাবে শিক্ষিত বা উচ্চ শিক্ষিত জনগণ তৈরি হচ্ছে সে হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এই বৈষম্য দেশকে মহা সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গে একমাত্র বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস-এ সরাসরি প্রায় ৪০-৫০ হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া টিএমএসএস হতে কয়েক হাজার বেকার যুবককে প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান করে আত্ম কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক।
উত্তরবঙ্গে উদ্বৃত্ত ফসল, ফলমূল বা মাছ-মাংস সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা হলে দেশে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হত তেমনি কৃষক পরিবার ও পণ্যের ভাল দাম পেত। উত্তরবঙ্গে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা হলে জনগণের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। যেকোন ফসল, ফলমূল পচনশীল। তাই উৎপাদনশীল উদ্বৃত্ত এই ফসল বা ফলমূলের একদিকে যেমন কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না, তেমনি পচেও অনেক ফসল নষ্ট হয়। উত্তরবঙ্গে ফসল শাকসবজি সংরক্ষণের জন্য ও ফলমূল উন্নতমানের কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা প্রয়োজন। উদ্বৃত্ত ফসল, শাকসবজি ও ফলমূল ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সম্মতভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের খাবার উৎপাদন করা যেতে পারে। আর এই প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফ্যাক্টরী বা ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা হওয়া প্রয়োজন। এই শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের উৎপাদন খাতে বা জিডিপিতে ব্যাপক অবদানের পাশাপাশি কর্মসস্থানের সৃষ্টি হবে।
আরও পড়ুনউত্তরবঙ্গের তৃণমূল পর্যায়ের রাস্তাঘাট বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। এতে তৃণমূল পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে দারুন অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে এবং তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনীতির চাকা না ঘুরলে দেশের অর্থনৈতিক সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঢাকা সহ বিভাগীয় শহর ও বাণিজ্যিক জেলাগুলোর সাথে সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথ ও আকাশ পথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় বড় নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণ করে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলার সাথে সংযোগ সড়ক তৈরি করে দূরত্ব হ্রাস করা হলে পণ্যবাহী যানবাহনের খরচ যেমন কমে আসবে তেমনি জ্বালানী খরচ ও সময় সেভকরা সম্ভব হবে।
গত ২৫/০৭/২৬ তারিখে বগুড়ার ফাইভ স্টার হোটেল মম ইন- এ ইতিহাস চর্চা পরিষদ ও কল্যাণ সংস্থার আয়োজনে উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ জেলার উন্নয়নে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উক্ত সেমিনারের পূর্বে ০৫টি জেলার যোগ্য প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত একটি ওয়ার্কশপে সম্ভাব্য উন্নয়নের চিত্র ওঠে আসে। সেমিনারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ০৫টি জেলার সংসদ সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এই সেমিনার বা ওয়ার্কশপের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা হলে উত্তরবঙ্গের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিষ্ট nazibar1980@gmail.com ০১৭১৩-৩৭৭০৭৮
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1787205527.jpg)
_medium_1787124760.jpg)
_medium_1787116893.jpg)
_medium_1787034688.jpg)
_medium_1787033535.jpg)
_medium_1786947032.jpg)
_medium_1787341122.jpg)
_medium_1787378160.jpg)
