ভিডিও শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২০ মে, ২০২৬, ০৪:৩০ দুপুর

যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের তাৎপর্য 

আরবী বছরের শেষ মাস জিলহজ মাস। হাদিসে আসছে “ইন্নামা ইবরতু বিল খাওয়াতীন” শরীয়তে শেষের অবস্থাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যেমন কেউ সারা জীবন মু’মিন ছিল কিন্তু মৃত্যুর সময় ঈমান হারা হয়ে মারা গেল তার স্থান হবে জাহান্নাম। আবার কেউ যদি সারা জীবন কাফের থাকে কিন্তু মৃত্যুর সময় ঈমান নিয়ে মারা যায় তো তার স্থান হবে জান্নাতে। এই জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রতিদিনের আমল এমনভাবে সাজিয়েছেন। আমরা যখন ঘুম থেকে উঠি তখন ইবাদত দিয়ে দিন শুরু করি। অর্থাৎ ফজর নামায পড়ি। আবার যখন ঘুমাতে যাই তখন ইশার নামায পড়ে ঘুমাতে যাই। আল্লাহ তায়ারা ফেরেস্তাদের জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা আমার বান্দাদের কি হাল দেখছো?” ফেরেস্তারা বলেন “হে আল্লাহ তায়ালা তাদের শুরু বন্দেগী এবং শেষও হয় বন্দেগীতে।” আল্লাহ তায়ালা বলেন “তাহলে আর কি, যার শুরু এবং শেষ বন্দেগী তার পুরোটাই বন্দেগী লিখে দাও।” এইজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শেষ মাসকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যেন মু’মিনের শেষটা ভালো হয়ে যায়। 

জিলহজ মাসে অনেক ইবাদত। নিম্নে কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইবাদত সমূহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়। (মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকী) এ হাদিস এর মর্ম হলো বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দিন সমূহে নেক আমল করার জন্য তার উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তার এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফযীলত প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লামা ইবন রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উপরোক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায়, নেক আমলের মৌসুম হিসেবে জিলহজ মাসের প্রথম দশক হল সর্বোত্তম, এ দিবসগুলোয় সম্পাদিত নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় “আহাব্বু তথা সর্বাধিক প্রিয়” শব্দ এসেছে আবার কোন কোন বর্ণনায় “আফযলু” তথা সর্বোত্তম শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব, এ সময়ে নেক আমল করা বছরের অন্য যে কোন সময়ে নেক আমল করার থেকে বেশি মর্যাদা ও ফযিলত পূর্ণ। হযরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন চারটি বিষয় এমন যেগুলি কে রাসূলে আকরাম (সা.) কখনও ছাড়তেন না। (১) আশুরার রোজা (২) জিলহজ মাসের প্রথম দশকের রোজা (৩) প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোজা (৪) ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত। (নাসাঈ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

আরাফা দিবসের ফজিলত: জিলহজ মাসের ৯ (নয়) তারিখ কে ইয়াওমে আরাফা বা আরাফার দিন বলা হয়ে থাকে। এই দিনটি যেমন ফজিলত পূর্ণ তদ্রুপ এর পূর্ববর্তী রাতটিও ফজিলত পূর্ণ। এই দিনটি সন্বন্ধে হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুলে আকরাম (রা.) ইরশাদ করেছেন, আমি আশাবাদী যে, আরাফাত দিবসের রোজা তার পূর্ববর্তী ১ বছর এবং পরবর্তী ১ বছরের গুনাহ মুছে দিবে। আর আল্লাহ তায়ালার নিকট এও আশাবাদী যে, আশুরার রোজা তার পূর্ববর্তী ১ বছরের গুনাহ মুছে দিবে। (মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)। উল্লেখ্য, প্রতি দিনের রোজা ১ বছরের রোজার সমান এবং প্রতিটি রাত ক্বদরের রাতের সমান মর্যাদা সম্পন্ন। যদি কেহ ১ম দিন থেকে ৯ম দিন পর্যন্ত শরীরের লোম বা চুল এবং নখ না কাটে তাহলে সে কবুল হজের সওয়াব পেয়ে যাবে। এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ এ সময়টা প্রত্যেকের কাজে লাগানো উচিত।

তাকবীর তাশরীক: জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর হতে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর সকল সাবালক পুরুষ, মহিলার জিম্মায় উক্ত তাকবীর একবার পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর মহিলাগণ নিম্নস্বরে পাঠ করবে। (আদ্দুররুল মুখতার)

কোরবানি করা: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন “আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন”। সুরা কাউছার-২। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে”। (ইবনে মাজাহ)

কোরবানির ফযিলত: নবীজী (সা.) বলেন, কোরবানিকৃত পশুকে তার শিং, পশম ও খুর ইত্যাদি সহ কিয়ামতের ময়দানে হাজির করা হবে এবং নেকির পাল্লায় তা ওজন করা হবে। আর কোরবানির পশু যবেহ করার সাথে সাথে তার রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহ পাকের দরবারে তা কবুল হয়ে যায়। সুতরাং, তোমরা সন্তুষ্ট চিত্তে কোরবানি কর। (তিরমিজি শরীফ)

কোরবানির হুকুম: জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয় হতে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত যদি কোন সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক মুকিম ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় অর্থাৎ ঋণ মুক্ত থাকা অবস্থায় সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা সমপরিমাণ নগদ টাকা বা ব্যবসায়ের মাল কিংবা নিত্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে তাহলে তার উপর নিজের পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়াজিব। (ফতওয়ায়ে শামী)

আরও পড়ুন

কোরবানির গোস্ত: (১) কোরবানি শরিকানা হলে গোস্ত ওজন করে সমানভাবে বন্টন করা জরুরি, অনুমান করে বণ্টন করা নাজায়েজ (আল বাহরুর রায়িক) (২) মুস্তাহাব বা উত্তম হচ্ছে-কোরবানির গোস্ত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজেরা খাবে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দিবে এবং এক ভাগ গরীব-মিসকিনদের দান করবে। তবে এটা ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব।

কোরবানির চামড়া: (১) কোরবানির চামড়া বিক্রি না করে পরিশোধন করে নিজে ব্যবহার করা যায়, তবে নিজে ব্যবহার না করলে বিক্রিত টাকা গরিব-মিসকিনদের সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। (২) কোরবানির চামড়ার ব্যবপারে উত্তম পন্থা হলো-তা গরিব, আত্মীয়-স্বজন বা দ্বীনি শিক্ষায় অধ্যয়নরত গরিব ও ইয়াতিম ছাত্রদের সরাসরি দান করে দেওয়া। তবে ইলেমদের দান করলে একদিকে যেমন দান করার সাওয়াব পাওয়া যায়, অপরদিকে ইলমে দ্বীন চর্চার সহযোগিতাও করা হয় এবং এতে সদকায়ে জারিয়ারও সাওয়াব পাওয়া যায়। (জাওয়াহিরুর ফিকহ)

লেখক :

মাওঃ ডাঃ শফিকুল ইসলাম মীর

ইমাম ও খতীব, 
কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ বৃন্দাবনপাড়া, বগুড়া।
মুহতামিম
দাঃ ইঃ আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) নূরানী মাদ্রাসা দঃ বৃন্দাবনপাড়া,বগুড়া  

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে গ্যাস লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড, দগ্ধ ৬

হিজবুল্লাহকে প্রকাশ্যে সমর্থন ইরানের, অনিশ্চিত শান্তি চুক্তি

৬৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাইরে থাকছেন : তথ্যমন্ত্রী

ভারত দলে সূর্যবংশী, বাদ অধিনায়ক সূর্যকুমার

জেলেনস্কির চিঠি ‘অমার্জিত’, জেলেনস্কির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান পুতিনের

‘পানি নিয়েও ব্যবসা’ অভিযোগের পর সিদ্ধান্ত পাল্টালো ফিফা