দরবেশ পাওয়া গেল না
ছোটবেলায় একটা গল্পের বই পড়েছিলাম, গল্পের বইটির নাম দুধ কলা দিয়ে পোষা। সেখানে একটি গল্প ছিলো, গল্পটির নাম ছিলো দরবেশ পাওয়া গেল না। এতোদিনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গল্পটি আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হলো, তাই লেখার শিরোনাম দিলাম, দরবেশ পাওয়া গেল না। গল্পটা ছিলো এই রকম, এক রাজার পুরাতন একজন ভৃত্য ছিলো, রাজার একবার মনে হলো, ভৃত্যটা বহুদিনের, সে বিশ্বস্ত কিনা তাকে একবার পরীক্ষা করা দরকার। কথা যা কাজ তাই, রাজা একদিন ওই ভৃত্যকে একশোটি স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে বলল, তুমি এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো দেখে দেখে আমার দেশের এতিম ছেলে মেয়েদের মধ্যে দান করে দিয়ে এসে আমার কাছে রিপোর্ট দিও। ভৃত্য স্বর্ণ মুদ্রাগুলো নিয়ে দেশের এতিম ছেলে মেয়েদের মধ্যে দান করে দিয়ে এসে সন্ধ্যায় যথারীতি রাজাকে রিপোর্ট দিলো। পরের সপ্তাহে রাজা দুইশোটি স্বর্ণ মুদ্রা ভৃত্যকে দিয়ে বলল এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো আমার দেশের বিধবা মহিলাদের মধ্যে দান করে এসে আমার নিকট রিপোর্ট দিও। যথারীতি ভৃত্য স্বর্ণ মুদ্রাগুলো দান করে এসে সন্ধ্যায় রাজার নিকট রিপোর্ট দিলো। পরের সপ্তাহে রাজা পাঁচশোটি স্বর্ণ মুদ্রা ভৃত্যটির হাতে দিয়ে বলল এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো দেখে দেখে আমার দেশের দরবেশদের মধ্যে দান করে এসে আমাকে যথারীতি রিপোর্ট দিও। ভৃত্য স্বর্ণ মুদ্রাগুলো নিয়ে চলে গেল। দেখা গেল সন্ধ্যা ছেড়ে রাত হয়ে যায় ভৃত্য আর ফেরে না, তখন রাজা তাঁর উজির-নাজিরের নিকট ঘটনাটি খুলে বলল। উজির-নাজির ঘটনাটি শুনে বলল, জাঁহাপনা ও আর আপনার দরবারে ফিরবে না, প্রথম প্রথম অল্প স্বর্ণ মুদ্রা দেখে আপনাকে বিশ্বাস ধরানোর জন্যে হয়তো কাউকে না দিয়েই কিংবা নিজের লোকদের দিয়ে এসে আপনাকে রিপোর্ট করেছে, এবার বড় অংক পেয়েছে, তাই এটা মেরে দিয়ে সে গা ঢাকা দিবে, সে আর ফিরবে না। এই সকল কথা বলতে বলতে অনেক রাত্রি হয়ে গেল, রাজা সবাইকে ঘুমাইতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে রাজা নিজেও বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে উদ্যত হতেই ঐ ভৃত্য ক্লান্ত দেহে ফিরে এলো, দেখা গেল তার হাতে সমস্ত স্বর্ণ মুদ্রাগুলো অক্ষত আছে। রাজা আর্শ্চয হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার স্বর্ণ মুদ্রাগুলো দান না করে তুমি এতো রাত্রিতে ফিরে এলে কেন ? তখন ভৃত্যটি বলল, জাঁহাপনা রাজ্যে যেখানে লোক দেখি সেখানে গিয়ে বলি এখানে কোন দরবেশ আছে কিনা, লোকজন সোজা-সাপটা উত্তর দেয়, না এখানে কোন দরবেশ নাই। সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় লোকজন জিজ্ঞেস করে দরবেশ কেন খোঁজেন। তখন আমি বলি, রাজার নির্দেশে আমি দরবেশদের কিছু স্বর্ণ মুদ্রা দিবো। দেখা যায় ওই লোকটি কিংবা তার নিজের কোন লোক দরবেশের পোশাক পরে অন্য রাস্তা দিয়ে সামনে এসে বলে আমি দরবেশ, স্বর্ণ মুদ্রাগুলো আমাকে দিন। ভৃত্য বলে ঐ সকল লোককে দেখে আমার মনে হয়েছে ওরা স্বর্ণ মুদ্রার লোভে দরবেশের বেশ ধারণ করেছে, ওরা প্রকৃত দরবেশ না, আর আমার আরও মনে হয়েছে যে প্রকৃত দরবেশ সেতো দুনিয়ার কোন সম্পদের আশা করার কথা না, তাই এই লেবাসধারি দরবেশদের স্বর্ণ মুদ্রাগুলো না দিয়ে আমি হন্যে হয়ে দরবেশ খুঁজতে গিয়ে রাত্রি হয়েছে এবং ভুয়া দরবেশদের স্বর্ণ মুদ্রাগুলো না দিয়ে আমি স্বর্ণ মুদ্রাগুলো ফেরত এনেছি। রাজা তখন ঐ ভৃত্যকে বললো, দরবেশ তুমি খুঁজে পাওনি কিন্তু আমি দরবেশ ঠিকই খুঁজে পেয়েছি, এই বলে রাজা ঐ স্বর্ণ মুদ্রাগুলোসহ আরও কিছু স্বর্ণ মুদ্রা ভৃত্যকে দান করে দিলো। এবার প্রাসঙ্গিকতায় আসি।আমরা এই সরকারের পূর্বে দেশে অনেকদিন গণতান্ত্রিক কোন সরকার পাইনি, আমরা এইবার গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছি, আর এই গণতান্ত্রিক সরকারের কার্যকলাপ কেমন হচ্ছে সে ব্যাপারে এই নিবন্ধের শেষের দিকে আলোচনা করবো। দীর্ঘদিন দেশে গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় ছিলো। অনেকে আবার ফ্যাসিস্ট বললে মাইন্ড করেন, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, তিনটি ভোটের কথা আপনাদের মনে আছে কি ? প্রথম ভোটে ১৭৩টি আসনে কোন ভোটই হয়নি, ওয়াক অভার নিয়েছেন, যেটা বিশ্বে নজির হয়ে আছে। বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক দেশে সংসদের অর্ধেক আসনেরও বেশি আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকার ইতিহাস ফ্যাসিস্ট সরকারই সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতার জোরে পুলিশ বাহিনী দ্বারা গণতন্ত্রকামি মানুষদের মারপিট করে লক্ষ লক্ষ বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলখানায় পুরে ফ্যাসিস্ট সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকলো। জনগণের মতামতের কোন তোয়াক্কা করলো না। তারপরের ভোট আরও ন্যক্কারজনক, দিনের ভোট রাতে করা হলো। নতুন কনসেপ্ট। ৬০% ভোট আগের রাতেই সীল মেরে সরকারি দলকে দেওয়া হলো, বিদেশীরাতো শুনে অবাক, এটা আবার কিভাবে সম্ভব দিনের ভোট রাত্রিতে করা। আবার পাঁচ বছর ফ্যাসিস্ট সরকার জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকলো। তার পরের ভোটটা আরও বেশি ন্যক্কারজনক, যখন সকল বিরোধী দল একযোগে নির্বাচন বর্জন করলো তখন ফ্যাসিস্ট সরকার নিজের দলের লোকজনকে দুইভাগে ভাগ করে দিয়ে তথাকথিত একটি নির্বাচন করলো, যে নির্বাচনে বিরোধী কোন দল ছিলো না, সরকারি দলের নেতারাই স্বতন্ত্র প্রার্থী সেজে নির্বাচন করে বিরোধী দলের আসন গ্রহণ করলো। এই নির্বাচনকে বলা হয় আমি আর ডামির নির্বাচন, আমরা আর মামারা মিলে নির্বাচন করা। অবশেষে একযোগে ছাত্র, জনতা, রাজনৈতিক দল রাজপথে নেমে পড়লো। প্রায় দেড় হাজার ছাত্র জনতা ও রাজনৈতিক কর্মীর রক্তের বিনিময়ে এবং হাজার হাজার নেতা কর্মীর অঙ্গহানির বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচালো। নবাব সিরাজদ্দৌলা নাটকের একটি ডায়লগের কথা মনে পড়ে গেল, “পাপ যে চাপা থাকে না হোসেন কুলি খান প্রাণ দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন, তুমি কি তোমার নিজের জীবনটা দিয়ে আর একবার প্রমাণ করতে চাও”। ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি, যা হওয়ার কথা তাই হয়েছে। মানুষের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে আপনারও অধিকার একদিন থাকবে না। আপনি মানুষকে ফাঁকি দিলে আপনাকে এক সময় ফাঁকিতে পড়তে হবে। আপনি প্রথম ষ্টেশনে টিকিট না কেটে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবেন, ২য় ষ্টেশনে আপনাকে তার মাশুল, বিলম্ব ফি সব কিছুই দিতে হবে, কোন কারণে ২য় ষ্টেশন পার হলেও ৩য় ষ্টেশনে আপনার নাতি-পুতিকে সব কিছু কড়া-গন্ডায় বুঝে দিতে হবে, এটাই সত্য, সুতরাং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে,আর এটা শুধুু রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নিলেই চলবে না, সবার জন্যেই সমান, সবাইকে একই শিক্ষা নিতে হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় টিকে রাখার জন্যে প্রজাতন্ত্রের যে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও সিভিল প্রশাসনের যে সকল কর্মকর্তা অতি উৎসাহী হয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে, তারা সুযোগ পেলে পল্টি মারার সমূহ সম্ভাবনা আছে, তবে ছাপোষা কিছু কিছু কর্মচারী যারা নিতান্ত চাকরি বাঁচানোর জন্যে কাজ করেছেন তাঁদের কথা আলাদা।
অবশেষে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালিন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরশাদ সরকারকে হটানোর পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে ১ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন। তিনি মাত্র ৩ মাসের মাথায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে স্বপদে ফিরে যান, অথচ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রায় ২ বছরের মত সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর অধিনে ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়। এই নির্বাচনে বেশ কিছু দল জোট করে এবং এককভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ছিলো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা জাতীয় পার্টির একটি আসন না পাওয়া। খুব সম্ভব ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখার পিছনে যে শক্তিটি কাজ করেছে সেটা হচ্ছে জাতীয় পার্টি এবং সেই কারণেই অঞ্চল ভিত্তিক এই দলটিকে জনগণ এবার ট্রামকার্ড দেখিয়াছেন।
বিএনপি কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা দেয় এবং এটা ছাড়াও বিএপির নির্বাচনি ইস্তেহার ছিলো। নির্বাচনি ইস্তেহারের ১ম কথাই ছিলে করবো কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। বিএনপি নির্বাচনি ইস্তেহারে যে সকল দফা উল্লেখ করেছেন তা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড,খাল খনন, দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যেই তা অনেকটাই বাস্তবায়ন করেছেন এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনি ইস্তেহারের সমস্ত ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে তাঁরা পালন করবে, কারণ তাঁদের মাথায় আছে তাঁরা জনগণের কাছে ওয়াদা করে ভোট নিয়েছে, সুতরাং জনগণের কাছে তাঁদের ফিরে যেতে হবে। একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় বসেছেন। দেশের ব্যাংকখাত লোপাট হয়েছে। লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমানতকারীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে। এই বেহাল দশা থেকে উত্তোরণের জন্যে সরকারকে সময় দিতেই হবে এর কোন বিকল্প নাই। প্রথম সংসদ অধিবেশন শেষ হয়েছে। প্রথম অধিবেশনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিলো আমেরিকা ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানী সংকট নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দল মিলে সংকট নিরসনের জন্যে দশ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা, এটা দেশের মানুষকে আশা জাগিয়েছে। দেশের জনগণ আগামী দিনে এমন সংসদই দেখতে চায়।
লেখক :
আরও পড়ুনএড. মোঃ মোজাম্মেল হক
আইনজীবী, বগুড়া।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








