মইনুল রোড থেকে ফিরোজা: স্মৃতিপটে নতুন ইতিহাসের হাতছানি
মানুষের জীবনে কিছু ঠিকানা থাকে, যা কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়- তা হয়ে ওঠে সময়, স্মৃতি, ইতিহাস ও আবেগের সম্মিলিত প্রতীক। ঢাকা সেনানিবাসের ৬, শহীদ মইনুল রোড ছিল ঠিক তেমনই এক অনন্য ঠিকানা। আমি যখন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করি। তখন থেকেই এই বাড়িটির সঙ্গে আমার পরিচয় শুধু প্রশাসনিক কাজের অংশ ছিল না; ধীরে ধীরে এটি আমার কাছে ইতিহাসের এক নীরব মহীরূহে পরিণত হয়। যার শেকড় প্রোথিত রয়েছে বাংলাদেশের আপামর জনতার হৃদয়ে।
২০০৯ সালের ১১ জুন এপিএস হিসেবে যোগদানের পরপরই গুঞ্জন শুনতে পাই, বেগম খালেদা জিয়াকে ৬ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে গভীর প্রশ্ন জেগেছিল- মইনুল রোডের এই বাড়িটি কি কখনো শুধুই বাড়ি হতে পারে? আমার কাছে উত্তরটি ছিল স্পষ্ট- না। কিছু জায়গা সময়ের সঙ্গে শুধু স্থান হিসেবে নয়, বরং অনুভূতি ও ইতিহাস একাকার হয়ে তা জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। ৬ নম্বর শহীদ মইনুল রোড ছিল তেমনই এক স্মৃতিচিহ্ন, যেখানে ব্যক্তিগত জীবন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং জাতীয় রাজনীতির ইতিহাস এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল।
সেনানিবাস যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই একান্ত সংরক্ষিত, স্পর্শকাতর ও মর্যাদাবাহী এলাকা। এখানে প্রতিটি স্থাপনা কেবল বসবাসের স্থান নয়; এটি নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। বহু সেনা কর্মকর্তা অবসরে এখানে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন- এমন নজিরও কম নয়। সেনানিবাসের অন্যান্য স্থাপনার মতো এই বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা কিংবা কেবলই বাড়ি নয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার পাশাপাশি এই বাড়ির গুরুত্ব ছিল আরও গভীর। এটি ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন; এক সময়কার সেনাপ্রধানের আবাস; পরে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি ঠিকানা; এবং দীর্ঘ সময় ধরে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত নিবাস। বাড়িটির প্রতিটি দেয়াল, আঙিনা, এমনকি প্রতিটি ধূলিকণাও স্মৃতির ধারক- যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। কত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, কত রাজনৈতিক উত্থান-পতন, কত আনন্দ, বেদনা ও বিজয়ের মুহূর্ত- সবকিছুই যেন সেখানে স্মৃতির স্বাক্ষর বহন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের স্বাক্ষ্য বহন করা এই অমূল্য স্মারক থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার স্মৃতিকে বিচ্ছিন্ন করতে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার হঠাৎ করেই বেগম খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত জাতীয় চেতনা ও সমষ্টিগত স্মৃতির ওপর এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
৩৮ বছরের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়ার জোরপূর্বক উচ্ছেদ: দীর্ঘ ৩৮ বছরের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের সেই বাসভবন থেকে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদকালে বেগম জিয়া তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, তবে তা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আইনজীবীরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, বাড়ি ছাড়ার বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ২৯ নভেম্বর ২০১০ আপিলের তারিখ ধার্য করেন। বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগে এভাবে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা আইনজীবীদের মতে নজিরবিহীন। বিএনপি অভিযোগ করেছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উচ্ছেদকালে বেগম জিয়াকে মালামাল আনতে অনুমতি দেয়নি। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপি সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে।
যেভাবে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু: ১৩ নভেম্বর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের স্মৃতিমাখা বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা শুরু হয়। বিএনপি সূত্র জানায়, ফজরের নামাজের আগে সাদা পোশাকের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেন। সকাল হলে পুলিশের সঙ্গে র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও যোগ দেন। ক্যান্টনমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন। জাহাঙ্গীর গেটসহ ক্যান্টনমেন্টের প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সকাল আটটার দিকে বাড়ির কর্মী ও আত্মীয় স্বজনকে বাইরে পাঠানো হয়, একইভাবে বাড়ির বাবুর্চিরাও বাইরে চলে আসেন।
সকাল ১১টার দিকে পুলিশ ও র্যাব প্রধান ফটক ভেঙ্গে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। মাইক ব্যবহার করে বেগম জিয়াকে বের হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে উচ্ছেদকারীরা তা করতে না দিয়ে তাঁকে বাইরে নিয়ে আসে। চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় দুইজন মহিলা পুলিশ ম্যাডামের হাত ধরে টেনে চেয়ার থেকে উঠিয়ে বের করেন। এ সময় তাঁর ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। একজন ভদ্র ও মার্জিত সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এ ধরনের অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণ নজিরবিহীন। উচ্ছেদের নীল নকশা প্রণয়নের জন্য সরকারি সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পর্যায়ক্রমে নেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ির বরাদ্দ বাতিল করা হবে। সেই বছরের ২০ এপ্রিল সামরিক ভূমি কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৫ দিনের মধ্যে বাড়ি খালি করার নোটিশ দেন।
বেগম খালেদা জিয়া নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৩ মে ২০১০ তারিখে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। এরপর ৭ মে আবার নতুন নোটিশ দেওয়া হয় এবং ২৪ মে তৃতীয় দফায় নোটিশ জারি করা হয়। হাইকোর্ট রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একটি রুল জারি করে, নোটিশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখে। এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ ২৩ আগস্ট আরও এক মাস এবং ১৭ ডিসেম্বর আরও ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি পায়।
অবশেষে, হাইকোর্টের রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৫ অক্টোবর ২০১০ তারিখে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাড়ির বরাদ্দ বাতিল করে এবং সামরিক ভূমি কর্তৃপক্ষের নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ করে। আদালত পরবর্তী এক মাসের মধ্যে আসবাবপত্র সরিয়ে বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেন। রায়ের ২৫ দিন পর, ৮ নভেম্বর ২০১০ তারিখ বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করার আবেদন করেন। তারা চেয়েছিলেন হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত রাখার অনুমতি (লিভ টু আপিল) এবং পরবর্তী আপিল দায়েরের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে ২১ নভেম্বর ২০১০ পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন জানান, “উচ্চ আদালতে বিচার নিষ্পত্তির আগে এভাবে উচ্ছেদ করা নজিরবিহীন।”তিনি বর্ণনা করেন, ফজরের নামাজের পর পুলিশ, র্যাব ও সাদা পোশাকের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মইনুল রোডের বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। পরে তারা প্রধান গেট ভেঙে প্রবেশ করে এবং বাড়ির কর্মীদের আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান।বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এবং সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট খোন্দকার মাহবুব হোসেন জানান, ২৯ নভেম্বর ২০১০ তারিখের আপিলের আগে সরকার সেনানিবাসের বাড়ি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে না- এমন আশ্বাস তারা প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে পেয়েছিলেন। বিএনপি নেতারা সরকারের এমন আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানান।
আরও পড়ুনএ বিষয়ে পরদিন, ১৪ নভেম্বর ২০১০ তারিখে The Daily Star শিরোনাম করেছিল- “I am evicted”- Begum Khaleda Zia. মনে হয়েছিল এটি কেবল একটি সংবাদশিরোনাম নয়; এটি ছিল ঐ সময়ে সকল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক যন্ত্র ব্যবহার করে ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে শুধু বাড়ি থেকে উচ্ছেদই নয় বরং দীর্ঘ ৩৮ বছরের স্মৃতিকে ধ্বংস করে স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাবহুল রাষ্ট্রীয় স্বাক্ষীকে চিরতরে মুছে দিয়ে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা এবং প্রতিহিংসার নোংরা রাজনীতির সূচনা করা। ৬নং মইনুল রোডের বাসার ইতিহাস ও স্মৃতি: ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সপরিবারে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেছিলেন। সেনাপ্রধান হওয়ার পরও তিনি এই বাসাতেই বসবাস করতেন। ঐ বাড়িতেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। এরপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ৩০ মে ১৯৮১ পর্যন্ত, এই বাড়িতেই সপরিবারে বসবাস করেছিলেন।
উল্লেখ্য, তৎকালীন মন্ত্রিসভার মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই বাড়িটি টোকেন মূল্যে ১৯৮২ সালে ইজারা দেওয়া হয়। বাড়িটির হোল্ডিং নং ছিল ১৯৬। এর পূর্বে, ১৯৮১ সালের ১৩ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক সেনানীবাসের ২.৭২ একর জমির এই বাড়িটি বেগম খালেদা জিয়ার নামে চিরস্থায়ী বরাদ্দ হিসেবে প্রদান করা হয়।
মইনুল রোডের ওই বাড়িতে অনেকগুলো ছোট ছোট পরিবারও বসবাস করত এবং উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে তারাও রাস্তায় বসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অনেক বাঁধা পেরিয়ে আমাদেরকে সেদিন ঐ বাসভবনে প্রবেশ করতে হয়েছিল। আমার উপর দায়িত্ব ছিল মালামাল বুঝে নেওয়ার। ম্যাডামের পিএস এ এস এম সালেহ আহমেদ স্যার, আমি এবং অফিসের অন্যান্য সহকর্মীরা বাড়ির প্রতিটি আসবাবপত্র, এয়ার কন্ডিশনারসহ সকল সামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করেছিলাম। ভেঙ্গে ফেলা হল শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রায় অর্ধ শতাব্দির স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি। আমি নিজে বাড়িটির প্রতিটি আনাচে-কানাচে ঘুরে দেখেছি। ম্যাডাম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত রহমান এবং জায়মা রহমানের বসবাসের ঘরগুলো আমি প্রত্যক্ষ করেছি। যদিও বাড়িটি অত্যধিক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না, তবুও এর আভিজাত্যপূর্ণ অতীত ও ইতিহাসের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট।
সেদিন গুলশানস্থ পার্টি অফিসে সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া কেঁদে ছিলেন। আমি নিজেও চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। সেখানে অনেককেই কাঁদতে দেখেছি। এভাবেই বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের ৬ নং মইনুল রোডের বাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য ছোটভাই শামীম ইস্কান্দারের বাসায় এবং পরবর্তীতে গুলশানস্থ “ফিরোজা”তে প্রত্যাবর্তন করতে হয়েছিল। এই “ফিরোজা”র সঙ্গেও আমার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ম্যাডাম যখন কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন, তখন নেতাকর্মীদের প্রবেশাধিকার ছিল, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই নিস্তব্ধ, চাপা উত্তেজনায় ভরা দিনগুলোতে আমরা, ম্যাডামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারাই যেন প্রতিদিনের অফিসের দায়িত্ব পালন করতাম ফিরোজাতেই। সত্যি বলতে, সেখানে প্রতিটি দিন কাটত এক ধরনের ভয়ের মধ্যেই। সারাদিন বাড়ির চারপাশে পুলিশ, র্যাব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের কঠোর অবস্থান চোখে পড়ত। বড় বড় বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে বাড়ির প্রবেশপথসহ চারদিক ঘিরে রাখা হয়েছিল।
অনেক দিন এমনও গেছে, দুপুরের মধ্যাহ্নভোজও ফিরোজাতেই সেরে নিতে হয়েছে। কিন্তু এই দুঃসহ সময়ের মাঝেও কিছু মানবিক, উষ্ণ ও হাস্যরসাত্মক মুহূর্ত আজও হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে আছে। ম্যাডামের বিশেষ সহকারী মাহবুব আলম ডিউ ভাই, বগুড়ার জামাই বলে আমাকে প্রায়ই স্নেহভরা মশকরা করতেন। ওয়েটারদের উদ্দেশ্যে মজা করে বলতেন, “এই যে জামাই এসেছে, নাস্তা দাও।”ম্যাডামের নির্দেশে উপর থেকে আসা সুস্বাদু নাস্তার স্বাদ আজও স্মৃতিতে অমলিন। রাজনৈতিক ঝড়, অবরুদ্ধ সময় আর উদ্বেগের ভেতরেও সেই আপ্যায়নের আন্তরিকতা যেন মানবিকতার এক উজ্জ্বল চিহ্ন হয়ে আছে। আর বছরে অন্তত দু’টি দিন তো ছিলই- যেদিন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ ম্যাডামের বাসায় সবার জন্য দাওয়াতের আয়োজন হতো।
আমার স্মৃতিপটে আজও মনে হয় আমি যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত করিডোর দিয়ে হেঁটে চলেছি। একদিকে ৬ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের নীরব স্মৃতি, অন্যদিকে ২নং গুলশানস্থ “ফিরোজা”- এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছি রাষ্ট্র, রাজনীতি, আদালত ও জনমতের এক জটিল সংলাপ। সময়ের স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়, কিন্তু কিছু দৃশ্য অম্লান থেকে যায়। কিছু দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু ইতিহাসের ভেতরে তাদের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ৬ নং মইনুল রোড থেকে গুলশানমুখী “ফিরোজা”য় সেই যাত্রা শুধু একটি স্থানান্তর নয়; এটি এক রাজনৈতিক ঠিকানার নতুন অভিযাত্রা। পরিশেষে বলতে চাই- ইট, কাঠ, পাথরে গড়া বাড়ি কিংবা ভূমি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমেই কাউকে রাজনীতি তথা পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা যায় না। স্থাপনা বদলায়, ঠিকানা বদলায়, রাজনৈতিক আদর্শ ও গণমানুষের বিশ্বাস ও আস্থার ঠিকানা কেড়ে নেয়া যায় না। বরং আরও সুসংহত ও সুদৃঢ় হয়।
লেখক:
ড. মোঃ সুরাতুজ্জামান
নির্বাহী চেয়ারম্যান
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ, অর্থ বিভাগ
ও
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার
সাবেক সহকারী একান্ত সচিব।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








