ভিডিও সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১১ মে, ২০২৬, ০৪:৩২ দুপুর

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়: পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ও প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলা এখন উচ্চশিক্ষার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটাতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষার পর বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (BSTU) একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ২০০১ সালে প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আইন পাস হলেও দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা শেষে ২০২৩ সালের ১০ মে সরকার আইনটি বাস্তবায়নে এসআরও জারি করে। এরপরই প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. কুদরত-ই-জাহান। বর্তমানে বগুড়ার উপশহরে অস্থায়ী কার্যালয়ে এর কার্যক্রম শুরু হলেও এটিকে একটি বিশেষায়িত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভারসাম্য তৈরি করবে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজ এলাকাতেই কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও মানবিক শাখায় বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেবে।একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইটের দালানের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ইকোসিস্টেম। এই প্রেক্ষাপটে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে স্থান নির্ধারণ থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অভিজ্ঞ স্থপতি, প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয় থাকা কেবল কাম্য নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য বাধ্যবাধকতা। একটি সার্থক মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা ছাড়া একটি বিদ্যাপীঠ কখনই তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। বিশেষ করে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থান নির্বাচন হতে হবে অত্যন্ত কৌশলী। যাতে সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপদ ভূমি, আধুনিক গবেষণাগার এবং শিল্প-শিক্ষা সমন্বিত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। ভৌগোলিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিচারে এন৫ (N5) জাতীয় মহাসড়কের সাথে সরাসরি সংযোগ বা এর নিকটবর্তী কোনো স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পরিবহন পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি ক্যাম্পাসকে অবশ্যই গণপরিবহন বান্ধব হতে হবে যেন তা একটি আঞ্চলিক 'নলেজ করিডোর' হিসেবে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বারগুলো এমনভাবে নকশা করতে হবে যেন হাইওয়ে ট্রাফিকের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে । 

বগুড়া বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি যন্ত্রাংশ ও মেটাল শিল্পের প্রধান প্রাণকেন্দ্র, যেখান থেকে দেশের মোট কৃষি যন্ত্রাংশের চাহিদার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মেটানো হয়। বিসিক শিল্পনগরীর এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের যোগসূত্র স্থাপন করা জরুরি। পরিকল্পনাবিদদের উচিত বিসিক শিল্প পার্কের নিকটবর্তী স্থান নির্বাচন করা, যাতে অটোমোবাইল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়ের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে গবেষণার সুযোগ পায়। শিল্প ও শিক্ষার এই মেলবন্ধন স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দিতে পারে । বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কমপক্ষে ৩০০ একর জমি প্রয়োজন, যেখানে ভবিষ্যতে কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া ভূ-তাত্ত্বিক সমীক্ষা ও মৃত্তিকা প্রকৌশলের গুরুত্ব এখানে অপরিসীম। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বগুড়া সদর এলাকার কিছু স্থানে ভূমিকম্পের সময় মৃত্তিকার তরলীকরণ বা লিকুইফ্যাকশন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে জোন-৩ এর অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলে ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে মাটির স্তর অস্থিতিশীল হতে পারে। তাই প্রকৌশলীদের অভিজ্ঞ পরামর্শে ভবনগুলোর ভিত্তির জন্য 'সারচার্জ লোডিং' বা বিশেষ ফাউন্ডেশন নকশা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই ক্যাম্পাসকে হতে হবে একটি 'স্মার্ট ক্যাম্পাস'। আইওটি (IoT) সক্ষমতা, স্মার্ট লাইটিং, এবং হাই-স্পিড ইন্টারনেট সুবিধার মাধ্যমে ক্লাসরুম থেকে লাইব্রেরি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে স্থপতিরা ভবনের নান্দনিকতা ও শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার নকশা করবেন, প্রকৌশলীরা নিশ্চিত করবেন কাঠামোগত নিরাপত্তা ও যান্ত্রিক উৎকর্ষ, আর পরিকল্পনাবিদরা নিশ্চিত করবেন জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও পরিবেশগত ভারসাম্য। সৌর শক্তি ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো গ্রিন টেকনোলজির প্রয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি টেকসই মডেলে রূপান্তর করতে পারে ।

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি ৫০ বছরের রোডম্যাপ অনুসরণ করে যদি এই বিদ্যাপীঠটি নির্মাণ করা যায়, তবেই এটি জাতীয় উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারবে। দেশের খ্যাতনামা স্থপতি ও প্রকৌশলীদের মেধার স্পর্শে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক এক আধুনিক জ্ঞানতীর্থ, এটাই আজ এই জনপদের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক:

আরও পড়ুন

প্রকৌশলী লিটন চন্দ্র দাস

সদস্য, ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (IEB)
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, 
পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়: পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

মন্ত্রী পদমর্যাদা ছাড়া কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিদেশি রাইফেলসহ ৭০ হাজার ইয়াবা জব্দ

এইচপি’র স্পিন বোলিং কোচ হলেন রাজ্জাক

হাম উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে : প্রধানমন্ত্রী