হামে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে
অনেকগুলো দ্বিধা। অনেকগুলো দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রাতভর ছটফট করি। ঘুম নেই। আকাশের তলপেটে বের হয় আর একটা ভোর। আমরা কি জড় পদার্থ হয়ে যাচ্ছি। এই স্বপ্নহীন সময়ে আমরা প্রত্যেকেই বহন করছি হামে মারা যাওয়া ৩০০ শিশুর লাশ। দেশের প্রায় সব জেলায় শুরু হয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। শিশুমৃত্যু কমবেশি ৩০০ জন এবং আক্রান্ত কযেক হাজার। ২০২৬ সালের প্রথমে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। অথচ এই ২০২৬ সালেই বাংলাদেশে হাম নির্মূল হবে এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। পরপর দুই বছর এ অবস্থা বিরাজ করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হামমুক্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ যোগ হতো। হাম নির্মূলের প্রধান অস্ত্র ইপিআই কর্মসূচির হাম-রুবেলার টিকা। শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে এ টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ এবং শিশুরাই সংক্রমণের শিকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশ শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ৮১ শতাংশ দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে টিকা পায়নি। সে হিসাবে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ শিশু এ টিকার কোনো ডোজই পায়নি। শিশুদের টিকা পাওয়া যেমন অধিকার, তেমনি দেশবাসীর জানার অধিকার-কী কারণে হামের প্রাদুর্ভাব হলো, তা আবার হাম নির্মূলের বছরে।
হাম-রুবেলার টিকা না পাওয়ার কারণ-আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রশাসনিক সর্বত্র সর্বগ্রাসী দৈন্য। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এক প্রতিবেদনে হাম নিয়ে বিপর্যয়ে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তনকে দায়ী করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউনিসেফ হাম নিয়ে এমন বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করলেও সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করে কিনতে চেয়েছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। যদিও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারকে হাম নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, হাম-রুবেলার টিকা কেনা নিয়ে যে যা-ই যুক্তি দিক না কেন, প্রায় ৩০০ শিশুর প্রাণহানি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। ইউনিসেফের সতর্কতা সত্ত্বেও কেন বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি, তার তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
মহামারি বা অতিমারির মতো কিছু না হলেও হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে আমরা এ কারণেই শঙ্কিত যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত মৃত শিশুর সংখ্যা ৩শতাধিক। মূলত ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের দিকে বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এ সংক্রামক রোগ এখন দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে জনস্বাস্থ্যের গুরুতর একটি সংকট হিসেবে হাজির হয়েছে। এটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটির তুলনায় সরকার থেকে এবং নাগরিক পরিসরে শুরুতে দোষারোপের রাজনীতি দেখা গেল। হামে আক্রান্ত শিশুদের কাউকে কাউকে করতে হচ্ছে নেবুলাইজ। হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়েতে হচ্ছে।
আশার কথা, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে ১৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, আগামীকালের মধ্যে আরো প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডোজ এমআর, টিডি, বিসিজি, টিসিভি, বিওপিভি ও পেন্টা ভ্যাকসিন দেশে পৌছাবে। গত বুধবার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ইউনিসেফ থেকে কেনা টিকার চালান গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে স্বভাবতই এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই ব্যর্থতার আঙুলটা ওঠে সরাসরি সরকারের দিকে। বর্তমান বিএনপি সরকার একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে দুই মাসও হয়নি। সরকার পরিচালনার শুরুতেই হামের এ প্রাদুর্ভাব তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে এসেছে বলতে হবে। কিন্তু সেই পরীক্ষা দিতে গিয়ে বরাবরের মতো দায় এড়ানোর নিরাপদ অবস্থানকেই যেন বেছে নিতে চাইল তারা। শুধু দায় এড়ানো নয়, অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার যে দীর্ঘ সংস্কৃতি, সেটির চর্চা দেখা গেল।আশার কথা-ইউনিসেফ ও গ্যাভির মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। অবিলম্বে অবস্থার উন্নতি হবে। তবে সমাজের সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করে পেশাদারিত্বে ফিরতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রশাসনিকসহ সবক্ষেত্রে দৈন্য দূর করে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। মায়ের কোলের ৩০০ শিশু জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিলো এ নিষ্ঠুর পৃথিবী তাদের নয় তারা শুধু ব্যক্তি গোষ্ঠীর মুনাফার বলি।
আরও পড়ুন
লেখক
মাহমুদ হোসেন পিন্টু
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








