নীরব বিষ থেকে শিশুদের বাঁচান!
“প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে,/আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।” উপরে লিখিত অংশটি বাংলা মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের বিখ্যাত রচনা অন্নদামঙ্গল থেকে নেওয়া। কবি ভারতচন্দ্র নবাব আলীবর্দী খাঁ ও মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় কবিতা লিখতেন। মানুষ একটা বয়সে পৌঁছনোর পর তার সন্তানের জন্য বাঁচে। সন্তানকে ঘিরেই জীবনের সকল কিছুর পরিকল্পনা করে। কীভাবে তার সন্তান ভালো থাকবে, কিসে মঙ্গল হবে এটাই থাকে একমাত্র ভাবনা। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপদে বেড়ে তোলা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটুকু সম্ভব? যেখানে যে কেউ চাইলেই একটি পণ্য প্যাকেট করে বাজারে চালিয়ে দিতে পারে! বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫-২৮% ৬ মাস থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। শিশুখাদ্য এবং খেলনা শহর থেকে মফস্বল, দোকান থেকে ফুটপাত সকল জায়গাতেই খুব সহজেই পাওয়া যায়। এসব তৈরি হয় শিশুদের জন্য, কিন্তু এর কয়টিই শিশুদের জন্য নিরাপদ? এই নিশ্চয়তা কোথায় পাবো? অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই নিশ্চয়তা প্রদান করার। গুরুতর ভেজাল বা বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহারে (স্পেশাল পাওয়ার এক্ট ১৯৭৪) ধারা ২৫(সি) এমন ভেজাল বা রাসায়নিক মেশানো যা মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করে শাস্তি হলো আজীবন কারাদন্ড অথবা মৃত্যুদন্ড অথবা দীর্ঘমেয়াদী সশ্রম কারাদন্ড এবং জরিমানা এটি সবচেয়ে কঠোর শাস্তির আইন। আর শিশুদের প্লাস্টিক খেলনা যা যত্রতত্র দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। অনেক নিম্নমানের প্লাস্টিকে থাকে BPA, Phthalates, Lead (সীসা) Cadmium এসব রাসায়নিক শিশুদের হরমোনের ব্যাঘাত, বৃদ্ধি ও বিকাশে সমস্যা মাথাব্যথা মনোযোগের ঘাটতি যৌন হরমোনের ক্ষতি করতে পারে। শিশুরা খেলনা মুখে দিয়ে চোষে। যদি খেলনায় ক্ষতিকর রং বা রাসায়নিক থাকে, তাহলে তা শরীরে ঢুকে যায়। এতে পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি বিষক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু শিশুদের খেলনা উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো আইন নেই, অথচ অন্যসব উন্নত দেশগুলোতে কঠোর আইন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শিশু খাদ্যে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদানকে GRAS (Generally Recognized as Safe) তালিকায় থাকতে হবে। মাইক্রোবায়োলজি টেস্ট বাধ্যতামূলক। Baby formula ১৯৮০ অনুযায়ী পুষ্টি উপাদানের ন্যূনতম-সর্বোচ্চ মান নির্ধারিত এবং উৎপাদন কারখানায় কঠোর HACCP মান রক্ষা, বাজারে ছাড়ার আগে ব্যাচ টেস্টিং বাধ্যতামূলক। অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের খেলনার জন্য AS/NZS ISO ৮১২৪ টেস্ট বাধ্যতামূলক। Magnet toys, balloon, soft toys— সবকিছুর আলাদা নিরাপত্তা মান নির্ধারিত রয়েছে। শিশু খাদ্যের ক্ষেত্রে পুষ্টিগত মান নিয়ন্ত্রিত, অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে বাংলাদেশে শহর কিংবা গ্রামে ছোট বড় দোকানে শুধু একটা পলিথিন প্যাকেটে এসব শিশুখাদ্য, শিশুদের খেলনা ঝুলতে দেখা যায়, বেশিরভাগের কোনো ধরনের বিএসটিআই সনদ তো নেইই বরং কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নামও থাকে না। গ্রামে তো বটেই শহরেও একই অবস্থা। এগুলো সব যাচ্ছে শিশুদের পেটেই কিন্তু দেখার কেউ নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, ধারা ৪২ অনুযায়ী মানহীন, ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ উপাদান যুক্ত খাবার বা পণ্য বিক্রি করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর জেল সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা উভয় দন্ড হতে পারে। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। এগুলো দেখার কি কেউ নেই?
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলাফল খুবই ভয়াবহ। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সাবেক সভাপতি মোল্লা ওবায়েদুল্লাহ বাকী জানান, ‘ভেজাল খাবার ও জাংক ফুডের ব্যবহার, অলস জীবনযাপন, দূষণ এবং তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার বাংলাদেশে ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। হাইপার অ্যাসিডিটি পুরুষ এবং নারী উভয়ের মধ্যেই সাধারণ। এ কারণেই খাদ্যনালীর ক্যানসারের ঘটনা বাড়ছে।’
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর দেশে যত শিশু মারা যায়, তার ১০ শতাংশ মারা যায় খাদ্যে ভেজালের কারণে। বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ, এবং প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গবেষণা অনুসারে, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১০৬ জন ক্যান্সার আক্রান্ত এবং প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হয় ৫৩ জন। একমাত্র সদিচ্ছার অভাবে এই মারাত্মক অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে অনুমোদন ছাড়া খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এবং খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান, ভেজাল মিশ্রিতকরণ ঠেকানো কঠিন কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশের যেকোন প্রান্তে খাদ্য অথবা শিশুদের খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছোট বা বড় যে পরিসরেই হোক, অনুমোদন এবং পণ্যে ব্যবহৃত উপাদান সমূহের সুস্পষ্ট বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু ছোট ছোট দোকানে অভিযান করলেই হবে না বরং বড় বড় আড়ত সিলগালা করতে হবে। শিশুখাদ্য এবং শিশুদের খেলনা উৎপাদন অনুমোদনে আরও কঠোর হতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোকে অনুসরণ করা যেতে পারে। রাষ্ট্র শিশুদের জন্য হোক। শিশুরাই ভবিষ্যত।
লেখক:
আরও পড়ুনসুরাইয়া আফরিন হিয়া
শিক্ষার্থী
সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








