ভিডিও বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৯ মে, ২০২৬ ০৪:০৬ পিএম

ভাইরাল ফুড কালচার ও এক অকাল মৃত্যু: আমরা কী শিখছি 

চায়ের দোকানের পাশে ছোট্ট একটি ভাজাপোড়ার স্টল। স্কুলের সামনে চিপস, ঝাল চানাচুর আর রঙিন পানীয়ের পসরা। বিকেলে  হাটের মাঠে ফুচকা-চটপটির ভিড়। একসময় শহুরে জীবনের অংশ হিসেবে পরিচিত এসব খাবার এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত  ছড়িয়ে পড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু-কিশোরেরাও প্রতিদিন এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। 

এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। সস্তা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সামাজিক মাধ্যম মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে দিয়েছে। এখন দেশের  যেকোনো প্রান্তের তরুণরা একই ফুড ব্লগার দেখছে, একই ভাইরাল ভিডিও দেখছে। রাজধানীর কোনো রেস্টুরেন্টের নতুন খাবার  ভাইরাল হলে কয়েক দিনের মধ্যেই তার নকল সংস্করণ মফস্বলের দোকানেও দেখা যায়। খাবারের গুণগত মান কেমন, সেটা বড় বিষয়  নয়-নামটা ভাইরাল হলেই যথেষ্ট। 

এই বাস্তবতার মাঝেই কারিনা কায়সারের অকাল মৃত্যু আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। একটি তরুণ প্রাণের এমন বিদায়  শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি সতর্ক সংকেত। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী,  তিনি দীর্ঘদিন লিভারজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন-অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দূষিত পানি ও  অনিরাপদ খাবার হেপাটাইটিসসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। 

বদলে যাওয়া খাদ্যসংস্কৃতি 

এক সময় অধিকাংশ পরিবারের দৈনন্দিন খাবার ছিল খুবই সাধারণ-সকালে মুড়ি-কলা বা ভাত, দুপুরে ডাল-শাকসবজি-মাছ, রাতে  পরিবারের সবাই মিলে ঘরের রান্না। এই খাবারগুলো হয়তো বিলাসী ছিল না, কিন্তু ছিল নিরাপদ ও পুষ্টিকর। 

আজ সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্কুল থেকে ফেরার পথে শিশুরা রাস্তার পাশ থেকে চিপস, ফাস্টফুড বা কোমল পানীয় কিনে খাচ্ছে।  বিকেলে মাঠে খেলার চেয়ে দোকানে বসে ভাইরাল খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক অভিভাবকও সন্তানের আবদার মেটাতে  এসব খাবার কিনে দিচ্ছেন, কারণ দাম তুলনামূলক কম এবং সহজে পাওয়া যায়।কিন্তু কম দামের এই খাবারের পেছনে যে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে আছে, সেটি নিয়ে সচেতনতা এখনো খুব সীমিত। 

সস্তা খাবারের নীরব বিপদ 

রাস্তার পাশের অনেক খাবারের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। চকচকে মোড়ক বা আকর্ষণীয় নামের আড়ালে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের তেল, ক্ষতিকর রঙ এবং অপরিষ্কার পানি। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাইও থাকে না। চিকিৎসকেরা বলছেন, হেপাটাইটিস ই-এর মতো ভাইরাস দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ফুচকার পানি,  শরবতের বরফ বা অপরিষ্কার রান্নার পরিবেশ-সবকিছুই ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এসবের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু  ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। 

শুধু লিভারের সমস্যাই নয়-অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনি-সমৃদ্ধ খাবার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা ও হৃদরোগের ঝুঁকিও  বাড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গভীর, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে। 

ফুড ব্লগিং ও ভাইরাল সংস্কৃতির প্রভাব 

কয়েক বছর আগেও ফুড ব্লগিং ছিল মূলত শহুরে বিনোদনের অংশ। এখন স্মার্টফোনের কারণে এটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। একটি  ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষ দেখে ফেলছে। 

আরও পড়ুন

ভিডিওগুলোতে সাধারণত খাবারের আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেখানো হয়-চিজ গলে পড়ছে, রঙিন পানীয় ঝলমল করছে, মানুষ আনন্দ  নিয়ে খাচ্ছে। কিন্তু দেখানো হয় না খাবারের মান, ব্যবহৃত তেলের গুণগত অবস্থা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি।

কিশোর-কিশোরীরা এসব ভিডিও দেখে সহজেই প্রভাবিত হয়। তারা নতুন খাবার চেষ্টা করতে চায়, ছবি তুলতে চায়, সামাজিক  মাধ্যমে শেয়ার করতে চায়। ধীরে ধীরে ঘরের ঐতিহ্যবাহী পুষ্টিকর খাবার তাদের কাছে “সাধারণ” হয়ে যায়, আর ভাইরাল খাবার হয়ে  ওঠে আকর্ষণের কেন্দ্র। 

পরিবারের খাবার টেবিল কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে 

একসময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার একটি সংস্কৃতি ছিল। খাবারের টেবিল মানে শুধু খাওয়া নয়, গল্প করা, সম্পর্ক গড়ে  তোলা, একে অপরের খোঁজ নেওয়া। আজ অনেক পরিবারে সেই দৃশ্য কমে যাচ্ছে। বাবা-মা ব্যস্ত, সন্তান মোবাইলে ডুবে আছে। কেউ বাইরে খাচ্ছে, কেউ অনলাইনে খাবার  অর্ডার করছে। ফলে শুধু পারিবারিক বন্ধনই দুর্বল হচ্ছে না, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও হারিয়ে যাচ্ছে। 
শিশুরা পরিবার থেকেই শেখে কোন খাবার ভালো, কোনটা সীমিত খেতে হয়। পরিবার যখন ঘরের রান্নার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়, তখন  নতুন প্রজন্মও বাইরের খাবারকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। 

মৃত্যুর পরও বিদ্রƒপ: কোথায় আমাদের মানবিকতা

 কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে বিদ্রƒপ ও ট্রল দেখা গেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন মানুষ পৃথিবী  ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও তাকে নিয়ে উপহাস করা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু একটি ভুলের মূল্য যদি জীবন দিয়েই দিতে হয়, তাহলে মৃত্যুর পর সেই মানুষটিকে নিয়ে কটূক্তি করা  কেবল নিষ্ঠুরতার প্রকাশ।আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ-সবকিছুই মৃত মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায়। সহানুভূতি ও দয়ার চর্চা না থাকলে  সমাজ ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হয়ে পড়ে। 

এখন কী করা দরকার 
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও গণমাধ্যম-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবারে ঘরের রান্নার গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। ডাল, শাকসবজি, মাছ ও দেশীয় খাবারের পুষ্টিগুণ নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে।  সন্তানদের সঙ্গে অন্তত দিনে একবার একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্য শিক্ষা আরও বাস্তবমুখী করতে হবে। শুধু বইয়ের অধ্যায় নয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা  তৈরি করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকেও রাস্তার খাবারের মান নিয়মিত তদারকি করতে হবে। কোন পানি ব্যবহার হচ্ছে, কী তেলে রান্না হচ্ছে-এসব বিষয়ে  নজরদারি বাড়ানো জরুরি। 

ফুড ব্লগারদের প্রতিও একটি দায়িত্ব রয়েছে। শুধু বাহারি খাবার নয়, স্বাস্থ্যকর দেশীয় খাবারকেও জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। একটি  সচেতন ভিডিও হাজারো মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। 

শেষ কথা

কারিনা কায়সার আর নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে-আমাদের সন্তানেরা প্রতিদিন কী খাচ্ছে?  রাস্তার পাশের রঙিন পানীয় বা ভাইরাল খাবার কতটা নিরাপদ? আমরা কি ধীরে ধীরে আমাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছি? 
একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। শহর হোক বা মফস্বল-ঘরের রান্না, নিরাপদ খাবার এবং  পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়ার সংস্কৃতির কোনো বিকল্প নেই। আর একে অপরের প্রতি একটু বেশি মানবিক হওয়াও আজ সমান জরুরি।
 
লেখক: 
মো. জাহাঙ্গীর আলম
পরিবেশ ও সমাজকর্মী, রাজস্ব বিশ্লেষক এবং নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথমবার ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন ভারতের

বিশ্বকাপ টিকেটের বরাদ্দ বাতিলের অভিযোগ ইরানের

পটিয়ায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবক খুন, আটক ১

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অপতৎপরতার প্রতিবাদে জবি ছাত্রদলের বিক্ষোভ

ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্টদের ফেরানোর চেষ্টা চলছে: সংসদে তাহের

ভারতে কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৭ বাংলাদেশি