ভিডিও রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৪:৩৪ দুপুর

নারীর সম্মান, ঘরের সন্তানের আহ্বান

বাংলাদেশের মানুষ এখন নির্বাচনের জোয়ারে ভাসছে। ভোটের রাজনীতিতে তৃণমূলে এখন নির্বাচনী জোয়ার বইছে। বাক-যুদ্ধ পেরিয়ে কোথাও কোথাও শারীরিক সংঘর্ষের খবরও গণমাধ্যমে চলে আসলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল বলেই মনে হচ্ছে। যদিও সামাজিক গণমাধ্যমে এখনও কেউ কেউ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখছেন। ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন বিএনপি’র প্রধান তারেক রহমানও। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি কারা কিভাবে এই ষড়যন্ত্র করছেন। এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশন গণভোটের প্রচারণায় কোন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণ নাগরিকদের মনে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও দেশ এখন নির্বাচনমুখী এবং সকলেই একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। 

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ১২ ফেব্রুয়ারী। এশিয়ার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ জাপানেও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আর সেই নির্বাচন হবে ৮ ফেব্রুয়ারী, আমাদের মাত্র ৪দিন আগে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নানা সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী সংবাদ যতটা উত্তাপ ছড়াচ্ছে জাপানের নির্বাচন মনে হচ্ছে যেন ততটাই নিশ্চুপ, গা সওয়া। এই পার্থক্য আমাকে বিস্মিত করেছে। জাপানের নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে কোন মহলের মধ্যেই কোন সংশয়, কোন কারচুপি বা সংঘর্ষের আশঙ্কা নেই অথচ বাংলাদেশে ঘন্টায়-ঘন্টায় পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। উত্তেজনার পারদ ওঠানামা করছে খুব দ্রুত। কৌতুহলী পাঠকের পক্ষে এখনও এই স্রোতের সাথে তাল মেলানোটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও আমরা কায়মনে প্রার্থনা করি, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। দেশের মানুষ বেছে নিক তাদের যোগ্য প্রার্থীদের। গঠিত হোক জনগণের সরকার। জনপ্রতিনিধিরাই ঠিক করুক কেমন হবে আগামীর বাংলাদেশ। যদিও এই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তথা সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি অর্থাৎ ইনক্লুসিভ নির্বাচন হচ্ছে না বলেও একটি সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যা পরিস্থিতির চাপে ততটা উচ্চকিত নয়। সেটা একটা ভিন্ন বাস্তবতা! 

জাপানের জাতীয় সংসদ দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট, আমাদের সংসদ এক কক্ষের। জাপানের জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি হলেও সেখানে নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা ৪৬৫ আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি হওয়া সত্বেও আমাদের প্রতিনিধি সংখ্যা মাত্র ৩০০টি, সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৩৫০ জন। বাংলাদেশের মতই জাপানে সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আইনসভা বা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে। জাপানের ইতিহাসে প্রথমবারের মত গত অক্টোবরে নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন মিস সানাই তাকাচি, যিনি ৭০% ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নিজ দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে পুনরায় অধিকতর শক্তি নিয়ে ডায়েটে তথা আইনসভায় প্রতিস্থাপিত করতে চাচ্ছেন যাতে করে তাঁর সরকার পরিচালনায় আরও সুবিধা হয়। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তাঁর এই কৌশল জয়ী হবে। জাপানের বহু আগে অর্থাৎ ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ নারী প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছিল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই গৌরবের মুকুট মাথায় নিয়ে সুনামের সাথে দেশ পরিচালনা করেছিলেন। উল্লেখ্য বাংলাদেশের পরবর্তি সরকারগুলিও কিন্তু রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের ধারা বজায় রেখেছিল। শুধু রাজনীতিতেই নয়, প্রশাসনেও নারীদের অংশগ্রহণ ও দায়িত্বপূর্ণ পদগুলিতে নারীদের অন্তর্ভূক্তি ছিল দৃশ্যমান এবং সেটা বাংলাদেশের মানুষের এগিয়ে চলায় গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। একজন শিক্ষিত মায়ের মতই একজন রাজনীতি সচেতন ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন নারী তার দেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবার পাশাপাশি নিজের পরিবার ও অপরাপর নারীদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরীতে সক্ষম। আগামীর বিশ্ব বাস্তবতায় নারীকে পিছনে ফেলে রেখে বা ঘরে অবরুদ্ধ করে কোন দেশ বা জাতি টিকে থাকতে পারবে না। নারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। এই সত্যকে অস্বীকার করা বোকামী। সমাজের কল্যাণে, সমৃদ্ধিতে এমনকি জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিয়ে যাঁদের সংশয়-সন্দেহ রয়েছে তাঁরা আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতাটি ভালভাবে পড়বেন। সেখানে নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন, “কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী, পুরুষের তরবারী; প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়ালক্ষী নারী”। 

ফিরে আসি তারেক রহমানের কথায়। তিনি প্রায়শ:ই বক্তৃতায় তাঁর সহধর্মিনী ডাঃ জুবাইদা রহমান এর প্রসঙ্গ টেনে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, তিনি (ডা: জুবাইদা) সহযোগিতা না করলে তাঁর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারী) গভীর রাতে শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভাতেও তিনি পুনরায় সেকথা বলেন। সেদিন রাতে মঞ্চে নিজেকে ‘ঘরের ছেলে’ উল্লেখ করে তারেক রহমান যে বক্তব্য রেখেছেন তা ইউটিউবে সকলকে শোনার জন্য পুনরায় অনুরোধ করছি। কী মার্জিত, সংক্ষিপ্ত এবং মায়ায় জড়ানো তাঁর প্রতিটি শব্দচয়ন! প্রকৃত ‘ঘরের ছেলে’র মতই তিনি উপস্থিত সকলের সাথে খোলামেলা ও আন্তরিক ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি কাউকে আক্রমণ করেননি, প্রতিপক্ষের নিন্দা করেননি, অনেক প্রতিশ্রুতি দেননি শুধু দোয়া চেয়েছেন। তাঁর যে আহ্বান বা অনুরোধ আমার হৃদয় ছুঁয়েছে সেটা হলো, “আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন বগুড়ার সন্তান হিসেবে, ভাই হিসেবে পুরো দেশের উন্নয়ন করে আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি। বগুড়ার উন্নয়ন যেমন করতে হবে, তেমনি সারাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা বগুড়ার নাম খারাপ করতে চাই না। আমাদের নায্য অধিকার পেতে গিয়ে যেন অন্যকে বঞ্চিত না করি। ঘরের মানুষ হিসেবে আপনাদের কাছে আমার চাইবার আছে। আমার স্ত্রী সহযোগিতা না করলে আমি যেমন এগিয়ে যেতে পারতাম না, তেমনি আপনারা সহযোগিতা না করলে আমি এগিয়ে যেতে পারব না। আজ আমি আপনাদের কাছে কিছু দিতে নয়, শুধু দোয়া চাইতে এসেছি, যেন আপনারা আপনাদের এই সন্তান তারেক রহমানকে নিয়ে অহঙ্কার করতে পারেন, সেই দোয়া করবেন।” 

আমি বগুড়ার সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের এই নিরহঙ্কার ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তব্য শুনে আপ্লুত হয়েছি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সাথে আমার মতভিন্নতা থাকলেও দেশের অধিকাংশ মানুষের মতই আমিও তাঁর সাফল্য কামনা করি। যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে তিনি ‘সবার আগে’ স্থান দিয়েছেন, সেই ওয়াদা তিনি পূরণ করে বগুড়াবাসীকে দেশবাসীর সামনে গর্বিত করবেন সেই দোয়া করছি। তিনি বাংলাদেশকে জাপানের আদলে বা তাঁর চেয়েও উন্নত এক জাতি হিসেবে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করবেন, নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান দিয়ে বাংলাদেশে সুযোগের সমতা অক্ষুন্ন রাখবেন এই প্রত্যাশা রাখছি। 

আরও পড়ুন

লেখক

আতাউর রহমান মিটন 

কলামিস্ট ও গবেষক 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারীর সম্মান, ঘরের সন্তানের আহ্বান

দেশের মানুষ আর আওয়ামী লীগকে দেখতে চায় না: খোকন

অন্ধকারে ইউক্রেন!

কালকিনিতে ২৩ ককটেলসহ যুবক আটক

বড় মেয়ে মাহাদিয়ার বিয়ে দিলেন নাইম-শাবনাজ

অবশেষে জয়ের দেখা পেলো লিভারপুল