বগুড়ায় তারেক রহমানের আগমন প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত
দীর্ঘ ১৯ বছর পর তার বগুড়ায় আগমন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সফর নয়; এটি একটি জেলার দীর্ঘ প্রতীক্ষা, একটি রাজনৈতিক পরিবারের বেদনার ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নতুন প্রত্যাশার প্রতীক। বগুড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এই জেলা শুধু জনসংখ্যা বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক সচেতনতা, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসের কারণেই বিশেষভাবে পরিচিত। সেই বগুড়ারই সন্তান তারেক রহমান। তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় ও বগুড়ার ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই জেলার মাটিতেই তার রাজনৈতিক মানসিকতার বিকাশ, এখান থেকেই তিনি সংগঠন ও নেতৃত্বের বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় ও প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির কারণে তাকে প্রায় দুই দশক প্রিয় জন্মভূমি থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এই অনুপস্থিতি কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন ও নির্মম পরিণতি। আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও আলোচিত অধ্যায়। মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের মাধ্যমে একটি বিরোধী দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারেক রহমান এই ধারাবাহিক দমননীতির অন্যতম ভুক্তভোগী। তার দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন আসলে একটি রাজনৈতিক অবস্থানের মূল্য, যা তাকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে চরম মূল্য দিতে বাধ্য করেছে।
এই দীর্ঘ নির্বাসনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল একজন সন্তানের মায়ের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে না পারার অসহায়তা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থতায় ভুগেছেন। কখনো কারাবন্দি অবস্থায়, কখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে তাকে কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। সেই সংকটময় মুহূর্তগুলোতে তারেক রহমান চাইলেও মায়ের পাশে থাকতে পারেননি। এটি কোনো আবেগী বর্ণনা নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর মানবিক দিক যেখানে একজন সন্তানের স্বাভাবিক অধিকারও রাজনৈতিক কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বেদনা বহন করেই তারেক রহমান বছরের পর বছর প্রবাসে থেকেছেন। দূর থেকে মায়ের চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, উদ্বেগে দিন কাটানো এই অভিজ্ঞতা একজন রাজনীতিবিদের চেয়েও একজন সন্তানের জীবনে গভীর ছাপ রেখে যায়। এই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা তার রাজনৈতিক জীবনকে আরও সংযত ও বাস্তববাদী করেছে-এমনটাই মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
তারেক রহমানের সঙ্গে বগুড়ার সম্পর্ক তাই কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক। কিন্তু এই বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নজরের ক্ষেত্রে অবহেলা। আওয়ামী লীগ শাসনামলে বগুড়া বহু ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থেকেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মতে, বিএনপির শক্ত রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণেই এই জেলার প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
একটি জেলার মানুষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয় এটি ন্যায়বিচার, সমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই বগুড়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই জেলা তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেনি। এই অবহেলার অনুভূতি বগুড়ার মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বগুড়ায় আগমন নতুন করে প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তার কাছে বগুড়ার মানুষের আশা কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চায় বগুড়া তার ন্যায্য উন্নয়ন ফিরে পাক, অবকাঠামো ও শিল্পায়নে সমান গুরুত্ব পাক এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আর কোনো বৈষম্যের শিকার না হোক। এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু অতীত স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বগুড়ার মানুষ আশা করে, তারেক রহমান এই জেলার দীর্ঘদিনের অবহেলা, সম্ভাবনা ও বাস্তবতার কথা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরবেন। এটি কোনো প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং বৈষম্যহীন উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা। আজকের বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে জনগণের প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই সময়ে তারেক রহমানের বগুড়ায় ফেরা অনেকের কাছে একটি প্রতীকী ঘটনা যা রাজনীতিতে ভারসাম্য, উন্নয়নে ন্যায় এবং নেতৃত্বে মানবিকতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন১৯ বছর পর তারেক রহমানের বগুড়ায় আগমন কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা নয়। এটি একটি জেলার দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাস, একটি পরিবারের বেদনার অধ্যায় এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশার নাম। এই প্রত্যাবর্তন যদি বগুড়ার মানুষের ন্যায্য অধিকার, উন্নয়ন ও মর্যাদার নতুন পথ খুলে দেয় তাহলেই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে।
লেখক
এ, কে, এম মনজুর আলম
সভাপতি
ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ,
বগুড়া অঞ্চল নির্বাহী কমিটি
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








