ভিডিও মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০১ পিএম

আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী

ম্যানহোলগুলো হয়ে উঠেছে নীরব মরণ ফাঁদ

ম্যানহোলগুলো হয়ে উঠেছে নীরব মরণ ফাঁদ

শহর মানেই ব্যস্ততা, কোলাহল। চারদিকে মানুষের ছুটে চলা সাথে যানবাহনের অবিরাম যাতায়াত। মানুষ প্রতিদিন ছুটে চলেছে নিজ প্রয়োজনে ও নিজ গন্তব্য। কর্মজীবী মানুষ ছুটে চলেছে কর্মস্থলে, শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্যস্ত শহরগুলোতে সড়ক ও যাতায়াত মাধ্যমগুলো মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরায় একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন এই চলার পথেই লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী বিপদ যা সামান্য অসতর্কতায় কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। এই বিপদগুলোর মধ্যে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে খোলা ও ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। 

ম্যানহোল মূলত বড় বড় শহরগুলোর রাস্তা বা ফুটপাতের নিচে তৈরি করা একটি প্রবেশপথ যার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পয়ঃনিষ্কাশন,ড্রেনেজ ও বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন পরিদর্শন করা হয়। সেই সাথে পরিষ্কার ও মেরামতের কাজও করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক শহরগুলোতে ম্যানহোলের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তবে,এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ম্যানহোলের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশ গুলোর মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের ম্যানহোলের ঝুঁকি ও এ সংক্রান্ত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের মত জনবহুল শহরগুলো। 

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ম্যানহোলের ঝুঁকির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে খোলা ম্যানহোল ও অরক্ষিত নালায় পড়ে প্রাণহানির বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে, গত ২১ জুন ২০২৬ গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ভারী বৃষ্টির পর পানিতে তলিয়ে থাকা একটি অরক্ষিত ড্রেনে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, ২৫ আগস্ট ২০২৬, রাজধানীর মিরপুর -১০ এ সেনপাড়া এলাকায় ম্যানহোলের কাজ করার সময় গাড়ি চাপায় ওয়াসার কর্মীর মৃত্যু হয়। আবার, চলতি বছরে আগস্টে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

ধানমন্ডি, মিরপুর ও কারওয়ান বাজার সহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে যায়। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে অরক্ষিত ম্যানহোল গুলোর অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে হয়ে ওঠে আরো ঝুঁকিপূর্ণ। আবার, বিগত বছরগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে ম্যানহোল সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২৯ জন। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই প্রাণহানির পেছনে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা। এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে একটি নয় রয়েছে অনেকগুলো কারণ। যেমন -দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা, নিয়মিত পরিদর্শন না করা এবং অরক্ষিত ম্যানহোলে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকা। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে সমস্যাটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা দেশের জন্য কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। তাই এখনই প্রয়োজন এ সমস্যার সমাধান করা। কার্যকর পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। 

প্রথমত, কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙ্গে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে বিপদ সংকেত বা ব্যারিকেড স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ম্যানহোলে মূলত লোহার ঢাকনা ব্যবহার করা হয় যা ভাঙাড়ি হিসাবে বিক্রি করা হয়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা বা চোরচক্র তাদের প্রয়োজনে ঢাকনাগুলো চুরি করে বিক্রি করে দেয় ফলে ম্যানহোলগুলো অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। তাই ম্যানহোলের ঢাকনা গুলো স্ক্র্যাপ ভ্যালু বা ভাঙাড়ি মূল্যহীন যেমন-হিংড ডাকটাইল আয়রন, লকিং সিস্টেম যুক্ত আরসিসি বা ফাইবার রিইনফোর্সড প্লাস্টিক ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, স্মার্ট সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যেন ম্যানহোলের ঢাকনা সরে গেলে বা চুরি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা প্রেরণ করতে পারে। চতুর্থত, বর্ষা মৌসুমের আগে ‘ম্যানহোলের অডিট’ নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়। 
পঞ্চমত,ম্যানহোলগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নর পাশাপাশি সেগুলোর আশেপাশের অবস্থা নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। ষষ্ঠত, আইন ও প্রশাসনিক তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। সপ্তমত, জনগণদের সতর্ক থাকতে হবে। কোথাও কোনো অরক্ষিত ম্যানহোল দেখলে তা এড়িয়ে না গিয়ে অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অরক্ষিত এসব ম্যানহোলের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা তাই শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। সেই সাথে সামাজিক গণমাধ্যম গুলোর মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। 

আরও পড়ুন

একটি উন্নয়নশীল দেশ বলতে শুধুমাত্র উঁচু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা আধুনিক অবকাঠামো নয় বরং দেশের নিরাপত্তা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা-ই উন্নয়নশীল দেশের বৈশিষ্ট্য। একটি দেশ তখনই উন্নতির দিকে ধাবিত হয় যখন সেই দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলো দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছি। অরক্ষিত ম্যানহোলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গড়ে উঠুক একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ , ইডেন মহিলা কলেজ । 

 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ম্যানহোলগুলো হয়ে উঠেছে নীরব মরণ ফাঁদ

১

বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

২

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৬

৩

সৈয়দপুর বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা

৪

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ, নিহত বেড়ে ১৪

৫

রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

৬