ভিডিও সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪২ এএম

ওসমান গনি

খাদ্যের নিরাপত্তা: এক অন্তহীন লড়াই 

খাদ্যের নিরাপত্তা: এক অন্তহীন লড়াই 

বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ কোন না কোন ভাবে এ দেশের প্রধান পেশা কৃষির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু যাদের কঠোর পরিশ্রমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে তাদের মূল্যায়ন কতটুকু হচ্ছে? বাংলাদেশ নামক এই বদ্বীপটির অস্তিত্বের শেকড় যুগ যুগ ধরে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে এর উর্বর মাটি এবং কৃষির সাথে। 

প্রলয়ংকরী বন্যা, প্রখর খরা, তীব্র সাইক্লোন কিংবা নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার এ দেশের বুক চিরে গেলেও এ দেশের কৃষকরা কখনো হাল ছাড়েননি। বুকফাটা কষ্টের মাঝেও তারা সোনা ফলাতে জানেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষির সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর শঙ্কা ও ভাবনা আজ সচেতন মহলে উঁকি দিচ্ছে। একদিকে লাগাতার অপরিকল্পিত কৃষিজমির সংকোচন, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চরম অনিশ্চিত আবহাওয়া, সবমিলিয়ে আমাদের কৃষিখাত আজ এক নীরব ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষির অবদান সর্বজনবিদিত হলেও, দুঃখজনক হলেও সত্য যে বরাবরই কৃষকরা তাদের ঘামঝরানো ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে ফসলের কাঙ্ক্ষিত লাভ চলে যায় অন্য কারও পকেটে, অথচ দিনশেষে প্রান্তিক কৃষককে পোহাতে হয় দেনার পাহাড় সমান বোঝা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন এর দায়ভার মূলত চাপে এই খেটে খাওয়া মানুষদের ওপরই।

একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন না হলে আগামী দিনে আমাদের নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে মার খাবে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাড়িঘর ও কলকারখানা নির্মাণের ফলে দেশের উর্বর কৃষিজমিগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গ্রাস হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্য এক ভয়াবহ খাদ্য ঘাটতির অশনিসংকেত বহন করছে।

এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে আমাদের প্রথাগত কৃষিকাজের গন্ডি পেরিয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে মনোনিবেশ করতে হবে। কৃষকদের জন্য উন্নত মানের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সার ও ডিজেলের ভর্তুকি সহজলভ্য করা এবং সঠিক সময়ে সেচের পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি কৃষি গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উপযোগী, লবণাক্ততা ও খরা-সহনশীল নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং মাঠ পর্যায়ে তার দ্রুত সম্প্রসারণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একই সাথে, কৃষিপণ্য পচন থেকে রক্ষা করতে এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পর্যাপ্ত হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ এবং এগ্রো-প্রসেসিং জোন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে না বাধ্য হন। পাশাপাশি, দেশের উদ্যমী তরুণ প্রজন্মকে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এর প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে হবে। 

আরও পড়ুন

কৃষি মানেই কেবল কায়িক পরিশ্রম বা রোদে পুড়ে মরার পেশা—এই প্রাচীন ও ভুল ধারণাকে বদলে দিয়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, ই-কমার্সভিত্তিক কৃষি বাজার এবং বাণিজ্যিক কৃষির ছোঁয়া আনতে হবে। শিক্ষিত যুবসমাজ যখন উদ্যোক্তা হিসেবে আধুনিক কৃষিতে পা বাড়াবে, তখন এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির পুরো দৃশ্যপট বদলে যাবে। রাষ্ট্র যদি তরুণদের জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করে এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহের একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই কৃষির প্রকৃত বিকাশ ও টেকসই রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে।

পরিশেষে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, দেশের কোটি মানুষের বেঁচে থাকা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমাদের কৃষির সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বৈষম্যের বৃত্ত থেকে এই খাতকে মুক্ত করে যদি সময়োপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না যায়, তবে তা কেবল গ্রামীণ জনপদের ক্ষতি করবে না, বরং গোটা জাতির আত্মমর্যাদা ও টিকে থাকার সংগ্রামকে কঠিন করে তুলবে। মাটির মানুষের মুখে দীর্ঘস্থায়ী হাসি ফোটাতে এবং একটি সুরক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল আগামী প্রজন্ম নির্মাণ করতে হলে কৃষি ও কৃষকের সর্বাঙ্গীন স্বার্থরক্ষাকেই জাতীয় নীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাদ্যের নিরাপত্তা: এক অন্তহীন লড়াই 

১

বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স : একদিনে গ্রেপ্তার ২ হাজার ৪০০

২

ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৩

শারদীয় দুর্গোৎসব : আজ মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা

৪

শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু পাকিস্তানের

৫

বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ

৬