ভিডিও সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:১১ পিএম

সিরাজাম মনিরা

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক উৎপাদন থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক উৎপাদন থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে না পারলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের কথা চিন্তাও করা যায় না। অথচ খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং ভোক্তার খাবারের টেবিল পর্যন্ত নানা স্তরে অনিরাপদ ও ভেজাল খাদ্যের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অতিরিক্ত মুন-াফার লোভে উৎপাদন ও সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, পচা-বাসি খাবার বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে বাজারজাতকরণ কিংবা খাদ্যে নিম্নমানের উপাদান মেশানোর মতো অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; এটি মানুষের সুস্থতা ও জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই খাদ্যে ভেজালকে নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। 

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো উৎপাদন পর্যায়ে নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কৃষিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। শাকসবজি, ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই কৃষকদের নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি অনুমোদিত কীটনাশক, নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং কীটনাশক ব্যবহারের বিধিবিধান সম্পর্কে নিয়মিত ও সর্বশেষ তথ্য জানানো জরুরি।

শুধু উৎপাদন পর্যায়ে সতর্ক থাকলেই হবে না; বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপেও নজরদারি প্রয়োজন। পচনশীল খাদ্য দীর্ঘ সময় তাজা দেখাতে কিংবা পচন রোধ করতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পচা-বাসি বা নিম্নমানের খাদ্যকে আকর্ষণীয় করতে কৃত্রিম রঙ ব্যবহারের ঘটনাও কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে বাজারে ছাড়ার মতো প্রতারণার ঘটনাও ঘটে। এসব কর্মকান্ড একদিকে ভোক্তাকে প্রতারিত করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা করা ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টিতে ভেজাল, দূষণ বা পুষ্টিমান-সংক্রান্ত সমস্যা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো সমস্যায় আক্রান্ত। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের পানীয়, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা ও মধুসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে এমন সমস্যা শনাক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। খাদ্যে রোধে ভেজাল বাংলাদেশে আইনি কাঠামো রয়েছে। সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে এবং এর আওতায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকার পরও যদি ভেজাল খাদ্যের বিস্তার অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে-আইনের প্রয়োগ ও নজরদারি কতটা কার্যকর? 

কেবল অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা বা শান্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত তদারকি, নমুনা পরীক্ষা, দ্রুত ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। উৎপাদক, কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা-সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। খাদ্য ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, সাময়িক অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে ভোক্তাকেও নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। খাদ্য কেনার সময় উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখা, মোড়ক ও লেবেল পরীক্ষা করা, পণ্যের উপাদান ও সংরক্ষণ নির্দেশনা পড়া এবং অস্বাভাবিক রং, গন্ধ বা চেহারার খাদ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। অনুমোদিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কেনার পাশাপাশি সন্দেহজনক খাদ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

খাদ্যে ভেজালের ক্ষতিকর দিক, নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ ও গ্রহণের নিয়ম, ভেজাল শনাক্তের উপায় এবং ভোক্তা অধিকার ও সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে গণমাধ্যম নিয়মিত জনসচেতনতামূলক তথ্য প্রচার করতে পারে। বিশেষ করে কৃষক, খাদ্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তার জন্য সহজবোধ্য ভাষায় এসব তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। বাহারি ও চটকদার বিজ্ঞাপনের আকর্ষণে যেন মানুষ নিম্নমানের বা অনিরাপদ খাদ্যপণ্য কিনতে প্রলুব্ধ না হয়, সে বিষয়েও সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ নয়, পণ্যের মান ও নিরাপত্তাই যে ক্রয়ের প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত-এই বোধ ভোক্তার মধ্যে তৈরি করতে হবে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। 

পাঠ্যবইয়ে নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ছোটবেলা থেকেই যদি একজন নাগরিক খাদ্যপণ্যের মান, লেবেল, মেয়াদ এবং নিজের ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সে আরও সচেতন ভোক্তা হিসেবে গড়ে উঠবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনা করে সাময়িক সাফল্য অর্জন করলে চলবে না। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবারের টেবিল পর্যন্ত একটি সমন্বিত, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা। কৃষককে নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ব্যবসায়ীকে দায়িত্বশীল হতে হবে, প্রশাসনকে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাকেও তার অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। 

সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর এই উদ্যোগকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিরাপদ করা গেলেই কেবল একটি সুস্থ প্রজন্ম ও নিরাপদ সমাজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন এ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় sirazammanira07@gmail.com

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক উৎপাদন থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত

তীব্র স্রোতে ঘাটে ভিড়তে না পেরে ভেসে গেল ফেরি

প্রধানমন্ত্রী যথাসময়ে ভারত সফর করবেন : দীনেশ ত্রিবেদী

যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে পর্নোগ্রাফির বৈধতা দিচ্ছে ইউক্রেন!

গোলের রেকর্ড গড়ে মেসির পাশে রাফিনিয়া

হরমুজের বাইরেও ‘নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ ঘোষণা করছে ইরান