ভিডিও বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪২ এএম

সুরাইয়া বিনতে হাসান

সংরক্ষিত মাছ চুরি: বিলুপ্তির পথে জলজ সম্পদ

সংরক্ষিত মাছ চুরি: বিলুপ্তির পথে জলজ সম্পদ

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় এবং জলাভূমি আমাদের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে মাছ শুধু আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় অংশই নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো সাম্প্রতিক সময়ে মৎস্য অভিযানে বারবার উঠে আসছে মাছ চুরি, অবৈধ শিকার এবং সংরক্ষিত মাছ পাচারের ঘটনা। এর ফলে বহু দুর্লভ ও দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। 

মাছের প্রজনন মৌসুমে সরকার প্রতি বছর নানা ধরনের অভিযান পরিচালনা করে। ইলিশের প্রজনন রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ, অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অন্যদিকে এক শ্রেণির অসাধু জেলে, ব্যবসায়ী এবং চোরাকারবারি আইন অমান্য করে রাতের অন্ধকারে মাছ শিকার করছে। শুধু সাধারণ মাছ নয়, শিকার হচ্ছে দুর্লভ ও সংরক্ষিত প্রজাতির মাছও। একসময় বাংলাদেশের নদী-নালা ভরে থাকত নানা দেশীয় প্রজাতির মাছে। পাবদা, গুলশা, বাইন, টেংরা, চিতল, বোয়াল, আইড়, মহাশোল এমন অসংখ্য মাছ ছিল সহজলভ্য।

আজ এদের অনেকগুলোই বাজারে খুব কম দেখা যায়, আর কিছু মাছ প্রায় হারিয়েই গেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো অবৈধ শিকার এবং নির্বিচারে মাছ ধরা। মৎস্য অভিযানে প্রায়ই দেখা যায় নিষিদ্ধ জাল, কারেন্ট জাল কিংবা সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ে। ফলে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায় না, প্রজননের আগেই ধরা পড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎ-পাদনকে ভয়াবহ-ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

দুর্লভ মাছ হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো জলাশয়ের সংকোচন ও দূষণ। নদী ভরাট, দখল, এবং শিল্পবর্জ্য প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ধবংস হচ্ছে। মাছের জন্য নিরাপদ পরিবেশ না থাকলে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন। মাছ চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো অনেক সময় খুব সংগঠিতভাবে কাজ করে।তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের সহায়তা পায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে কিছু জাল জব্দ বা জরিমানা করলেও মূল সমস্যার সমাধান হয় না। এই চক্র ভাঙতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু প্রশাসনকে দায়ী করলে চলবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। জেলেদের সচেতন হতে হবে যে আজ বেশি মাছ ধরার লোভ ভবিষ্যতে তাদের জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলবে। ব্যবসায়ীদেরও সংরক্ষিত বা নিষিদ্ধ মাছ কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে।

আরও পড়ুন

সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে যাতে তারা অবৈধভাবে ধরা মাছ কিনতে নিরুৎসাহিত হয়। প্রযুক্তির ব্যবহারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা, ড্রোন নজরদারি, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ শিকার ও চুরি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের জলজ সম্পদ রক্ষা করা মানে শুধু মাছ রক্ষা করা নয়, এটি আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে একসময় আমাদের পরিচিত বহু দেশীয় মাছ শুধু বইয়ের পাতায় কিংবা স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের নদী, খাল ও জলাশয় একসময় নানা প্রজাতির মাছের নিরাপদ আবাসস্থল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সংরক্ষিত মাছ চুরি, অবৈধ শিকার ও পরিবেশ দূষণের কারণে বহু প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এই সংকট শুধু জলজ সম্পদের নয়, পুরো পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি। মৎস্য অভিযানে ধরা পড়া মাছ চুরির ঘটনাগুলো আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ। দুর্লভ মাছ হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া। তাই এখনই সময় সম্মিলিতভাবে কাজ করার- প্রশাসন, জেলে, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হয়তো আমরা আমাদের নদী-নালা ও জলাশয়ের হারিয়ে যাওয়া মাছগুলোকে বাঁচাতে পারব।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
suraiyabintehasan12@gmail.com

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সংরক্ষিত মাছ চুরি: বিলুপ্তির পথে জলজ সম্পদ

আজ রাতে দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস

রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান: ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৩৮ 

নেপালে আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১১২৭

থার্ড টার্মিনালে বিমানবাহিনীর তিনজন নিহতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

হাসপাতালে ভর্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী টুকু