যমুনা দ্বিতীয় সেতু: সারিয়াকান্দি-জামালপুর রুটেই উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের সেরা বিকল্প
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম। সড়ক, সেতু ও রেলপথের উন্নয়ন একটি দেশের উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই বাস্তবতায় যমুনা নদী বাংলাদেশের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য একটি বড় ভৌগোলিক প্রতিবন্ধক। ১৯৯৮ সালে যমুনা বহুমুখী সেতু চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে যুগান্তকারী পরিবর্তন এলেও আজ প্রায় তিন দশক পর স্পষ্ট হয়েছে যে একটি মাত্র সেতুর ওপর সমগ্র উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্ভরশীল রাখা আর বাস্তবসম্মত নয়। তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। আর সেই সেতুর জন্য বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ রুটই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিকল্প। বর্তমানে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ কিংবা সিলেট অঞ্চলে যেতে অধিকাংশ যানবাহনকে যমুনা সেতুর ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহনের চাপ এই সেতুকে প্রায় ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। ঈদসহ বড় উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ যানজটের কারণে সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পচনশীল কৃষিপণ্য সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে দ্বিতীয় একটি সেতু শুধু বিকল্প নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন। সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসা। বর্তমানে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা বা ময়মনসিংহ যেতে প্রায় ১৮৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। নতুন সেতু নির্মিত হলে এই দূরত্ব প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে যাতায়াতের সময় কমবে, জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে, পরিবহন খরচ কমবে এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমে পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল। বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁসহ বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রতিদিন চাল, আলু, সবজি, ভুট্টা, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হয়ে যায় সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ সেতু নির্মিত হলে উত্তরবঙ্গ থেকে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে দ্রুত কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন। শুধু কৃষি নয়, এই সেতু শিল্প ও বাণিজ্যেও নতুন গতি আনবে। বগুড়া উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পাইকারি বাজার এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে যমুনা চরাঞ্চল থেকে সংগৃহীত পাথর ও অন্যান্য সম্পদ দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা যাবে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বর্তমান যমুনা সেতুর ওপর নির্ভরশীলতা একটি বড় ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে। কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে যদি সেতুটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পুরো উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বড় নদীর ওপর একাধিক সেতু নির্মাণ করে এমন ঝুঁকি অনেক আগেই কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি একটি স্থায়ী সেতু। বর্তমানে যমুনা পারাপারে নৌকাই প্রধান ভরসা। বর্ষাকালে এই যাতায়াত আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতীতে বিকল্প নৌযান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। ফলে একটি সেতু এই অঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং নিরাপদ জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। এই সেতু নির্মাণ আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের উন্নয়ন অনেকাংশে ঢাকা-কেন্দ্রিক হয়েছে। অথচ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কৃষি, শিল্প ও মানবসম্পদের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ সীমাবদ্ধতার কারণে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আসেনি। নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে। এর ফলে নতুন শিল্পাঞ্চল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, গুদাম, পরিবহন হাব এবং লজিস্টিকস কেন্দ্র গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নির্মাণকালেই হাজার হাজার প্রকৌশলী, শ্রমিক ও কারিগরি কর্মীর কাজের সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সংযোগ সড়কের পাশে গড়ে উঠবে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পেট্রোল পাম্প, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, গুদাম ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই সেতুর সম্ভাবনা কম নয়। যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, নদীর মনোরম সৌন্দর্য, বগুড়ার মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান উন্নত যোগাযোগের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে আরও সহজলভ্য হবে। এতে স্থানীয় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।বিকল্প রুট হিসেবে বালাসী-দেওয়ানগঞ্জের কথা বলা হলেও অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত বিবেচনায় সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুট অধিক কার্যকর। এটি সরাসরি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বগুড়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। ইতোমধ্যে এই রুটে প্রাথমিক ট্রাফিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রকল্পটির বাস্তবায়নযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করে।অবশ্যই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নদীশাসন, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং চরাঞ্চলের মানুষের পুনর্বাসনের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, স্বচ্ছ পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত। দেশের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (চচচ) মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন ব্যয় সাশ্রয়, কৃষি ও শিল্পের প্রসার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের কারণে এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে।সময় নষ্ট না করে এখনই রুট চূড়ান্ত করে সমীক্ষা, নকশা ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে। যত দ্রুত সিদ্ধান্ত হবে, দেশের অর্থনীতিও তত দ্রুত এর সুফল পাবে।একটি সেতু কেবল ইস্পাত, কংক্রিট ও পিলারের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সারিয়াকান্দি-জামালপুর দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে, জাতীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে এবং যমুনার দুই তীরের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। তাই জাতীয় স্বার্থে এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান
আরও পড়ুনপিএইচডি গবেষক, ঢাবি
ও ক্লাব সেক্রেটারি, বগুড়া প্রফেশনালস্ ক্লাব।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








