ভিডিও শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৯ মে, ২০২৬, ০৭:৫৯ বিকাল

ভর্তুকির অভাব নাকি অব্যবস্থাপনা : ঢাবির হলে নিম্নমানের খাবারের দায় নিচ্ছে না কেউ

ভর্তুকির অভাব নাকি অব্যবস্থাপনা : ঢাবির হলে নিম্নমানের খাবারের দায় নিচ্ছে না কেউ

ঢাবি প্রতিনিধি: প্লেটে ভাতের পাশে ছোট্ট এক টুকরো মুরগি কিংবা মাছ। সঙ্গে আধাসেদ্ধ সবজি। কখনো খাবারে মিলছে পোকা, কখনো চুল। অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘরে তৈরি হওয়া এসব খাবারই প্রতিদিন খেতে বাধ্য হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলের হাজারো শিক্ষার্থী। নিম্নমানের খাবার, অপর্যাপ্ত পুষ্টিগুণ ও তদারকির অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, হল ডাইনিং, ক্যাফেটেরিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্যান্টিন ও দোকানে স্বাস্থ্যকর খাবারের সংকট দীর্ঘদিনের। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাবির আবাসিক হলগুলোতে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে তুলনামূলক কম খরচে খাবারের জন্য তাদের প্রধান ভরসা হল ক্যান্টিন। কিন্তু সেই ক্যান্টিনগুলোর খাবারের মান নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি অভিযোগ।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কবি জসিমউদ্দীন হলের ক্যান্টিনে প্রতি পিস মাছ বা মুরগির মাংসের দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা হলেও খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেক সময় বাধ্য হয়েই এসব খাবার খেতে হচ্ছে। সবজির মান আরও খারাপ। প্রায়ই পচা সবজি রান্নার অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়ায়। এমনকি খাবারে মাছি, পোকাসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ পাওয়ার ঘটনাও নিত্যদিনের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্যান্টিনের রান্নাঘর অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই রান্না করা হচ্ছে খাবার। ক্যান্টিন ও দোকানগুলোতে কাজ করা অনেক কর্মচারীরই স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। এছাড়া রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের তেল, অতিরিক্ত টেস্টিং সল্টসহ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান।

তদারকির অভাবের অভিযোগ:


২০২৩ সালের এক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ক্যান্টিনের খাবারে ই. কোলাইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী হাউস টিউটরদের প্রতি সপ্তাহে ক্যান্টিন তদারকি করার কথা থাকলেও বাস্তবে খুব কমই তাদের দেখা যায়। ফলে অবাধেই বাসি, পচা ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্যান্টিন কর্মচারী বলেন, “স্যারেরা কয়েক মাস পর পর একবার আসেন। নিয়মিত কেউ খোঁজ নেয় না।”

রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী লিজা আক্তার বলেন, “হলের খাবারের মান এতটাই খারাপ যে প্রথমবার কেউ এই খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। খাবারে পোকা বা চুল পাওয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে। অভিযোগ করলেও ক্যান্টিন মালিকরা গুরুত্ব দেন না। হল প্রশাসনও যেন না জানার ভান করে।”

আরেক শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা বলেন, “এটা শুধু দামের সমস্যা নয়, প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতারও বিষয়। ডাকসু নির্বাচনের আগে-পরে খাবারের মান উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিটি ক্যান্টিনে নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি।”

বাজারদরের চাপে ক্যান্টিন মালিকরা:


অন্যদিকে ক্যান্টিন পরিচালনাকারীরা বলছেন, বর্তমান বাজারদরে নির্ধারিত কম মূল্যে মানসম্মত খাবার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক জমির উদ্দিন বলেন, “বর্তমান বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, সেখানে ভালো খাবার দিতে গেলে লাভ থাকে না। খাবারের দাম কিছুটা বাড়ানো গেলে মানও উন্নত করা সম্ভব।”

আরও পড়ুন

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কাজী রেজাউল করিম বলেন, “শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিন বা মেসে যে খাবার খায়, তা মোটেও সুষম খাবার নয়। ছোট এক টুকরো মাছ বা মাংস থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া সম্ভব না। খাবারে ফল নেই, পর্যাপ্ত সবজি নেই, ভালো মানের তেলও ব্যবহার করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।”

ভর্তুকি ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি:

সমাধান হিসেবে শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিনে ভর্তুকি বৃদ্ধি, কঠোর নজরদারি এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রশাসনিক তদারকি ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারাও খাবারের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, “একসময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্যান্টিনে ফাও খেতো। তখন ক্যান্টিন মালিকরা চাইলেও কম দামে ভালো খাবার দিতে পারতেন না। কিন্তু এখন নিম্নমানের খাবারের জন্য প্রশাসনের উদাসীনতাই বেশি দায়ী। ডাকসু নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা থাকলেও বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে হল ডাইনিংগুলো এনে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির মাধ্যমে শিক্ষার্থীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।

খাবারের মান নিশ্চিত করতে ডাকসুর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, “ডাকসুর পক্ষ থেকে নিয়মিত ক্যান্টিন তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে ভর্তুকির দাবিও জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”

তিনি জানান, ডাকসুর পক্ষ থেকে টিসিবির মাধ্যমে ক্যান্টিনে কম দামে পণ্য সরবরাহের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর সেটি আর এগোয়নি।

আশ্বাস প্রশাসনের:

এ বিষয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বলেন, “ভর্তুকি বাড়ানো গেলে খাদ্যের মান কিছুটা উন্নত হতে পারে। তবে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মান বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।”

তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে এবং খাবারের মান উন্নয়নে কাজ চলছে।

প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ও স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, “বিভিন্ন হলে অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। কিছু হলে সীমিত ভর্তুকিও দেওয়া হচ্ছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, “টিসিবি থেকে পণ্য সংগ্রহ করা গেলে কম খরচেই মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে আগামী প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় আলোচনা করা হবে।”

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভর্তুকির অভাব নাকি অব্যবস্থাপনা : ঢাবির হলে নিম্নমানের খাবারের দায় নিচ্ছে না কেউ

আরাকান আর্মির হাতে জিম্মি ১৪ জেলেকে ফেরত আনলো বিজিবি

বিশ্বকাপে খেলবে ইরান, দিলো ১০ শর্ত

ফটিকছড়িতে বেয়াইয়ের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ

ঢাকা ১২০৫ নিয়ে ভাবনা

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আফরোজা নামের এক গৃহবধূর আত্মহত্যা