ভিডিও সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:১৯ বিকাল

দৌড়ই এখন জেবার পরিচয় 

দৌড়ই এখন জেবার পরিচয় 

নিজের আলোয় ডেস্ক : ছোটবেলা থেকেই দূরন্ত ও চঞ্চল জেবা। রাজধানী শহরে বেড়ে ওঠা এই দুরন্ত মেয়ের নেশা ছিলো খেলাধুলা। খেলাধুলাপ্রিয় বাবার সংস্পর্শই তাকে খেলার প্রতি অনুপ্রাণিত করেন। বাবার অনুপ্রেরণাই এক সময় খেলাধুলার এই নেশাই তাকে নিয়ে যায় ম্যারাথনের কঠিন পথে। জেবার পুরো নাম হামিদ আক্তার জেবা। বাবা-মা, ভাই ও ভাবির সঙ্গে তিনি ঢাকায় বসবাস করেন। জেবার সেই নেশাই এখন তার পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন জেবা।

ছোটবেলা থেকে জেবা ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। মাঠে সময় কাটানো ছিল তার প্রিয় কাজ। স্কুলজীবন থেকে বিভিন্ন খেলায় যুক্ত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি দৌড়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো একটি লং রানে অংশ নেন জেবা। দৌড়ের দূরত্ব ছিল ৫ কিলোমিটার। তার কাছে দৌড় হলো স্বাধীন একটি খেলা যেখানে কোনো টিম প্র্যাকটিস নেই, নিজের সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী নিজেকে গড়ে নেওয়া যায়।

মেয়েরা ট্র্যাকে দৌড়াবে এই ধারণা সমাজে সহজে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি আমাদের দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় দৌড় শুরু করায় কোনো নেতিবাচকতাকে গুরুত্ব দেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারও তাকে সমর্থন দিয়েছে। শুরুতে মা পুরোপুরি আপত্তি করলেও এখন তিনিও জেবার বড় সমর্থক।

এ পর্যন্ত জেবা অংশ নিয়েছেন প্রায় এক শ ম্যারাথন এবং দৌড় প্রতিযোগিতায়। তার উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকা ম্যারাথন ২০২১-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়া, বিমান হাফ ম্যারাথন ও একটি ৪৫ কিলোমিটার আলট্রা এবং একটি ৫০ কিলোমিটার আলট্রা ম্যারাথনে অংশ নেওয়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জেবার সাফল্য উল্লেখ করার মতো। লাদাখ ম্যারাথনে তিনি চতুর্থ এবং সম্প্রতি কাঠমান্ডু ম্যারাথনে দ্বিতীয় হয়েছেন। সার্ক অঞ্চলে প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তার ঝুলিতে। জেবা আরও জানিয়েছেন, কাঠমান্ডু ম্যারাথনে পাওয়া আন্তর্জাতিক পদক তাকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

ম্যারাথন থেকে পাওয়া টাকা জেবার জীবনে বিলাস নয়, বরং প্রয়োজন। এই আয় দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৌড়ের উপযোগী জুতা কেনেন এবং কিছু পারিবারিক খরচ চালান।

দৌড়ের পথে বড় পরীক্ষা আসে ২০২২ সালের একটি ম্যারাথনে যা আজও তার জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আগেও শরীরে হালকা অবশ ভাব হতো। কিন্তু সেদিন স্ট্রেচিংয়ের সময় তার পা পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়। দাঁড়াতে পারছিলেন না তিনি। বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাসায় ফিরে যেতে বলেছিলেন। অনেক চেষ্টা, পানি পান, শরীর নড়াচড়া কিছুই কাজে আসেনি। এরই মধ্যে ৪২ কিলোমিটারের দৌড় শুরু হয়ে যায়। আর জেবা লজ্জায় চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আরও পড়ুন

হাঁটার শক্তিও ছিল না তার, পা কাঁপছিল। যেকোনো সময় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তার। শেষ পর্যন্ত সবার পেছনে এক ল্যাপ দিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়েন তিনি। চারপাশে ভলান্টিয়ার, আর্মির গাড়ি, বাইক, অ্যাম্বুলেন্স দৃশ্যটা যেন গার্ড অব অনারের মতো। অথচ বাস্তবে তারা প্রস্তুত ছিল তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এরপর ২১ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে মেডিকেল বুথে শুয়েও কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি। সবাই বলছিল আজ আর সম্ভব নয়।

কিন্তু জেবা হাল ছাড়েননি। হাঁটা শুরু করেন, এরপর হালকা জগিং। ধীরে ধীরে তার ফিরে আসে দৌড়ের ছন্দ। হাতিরঝিল অংশে উঠতেই ভয় কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা ৪৬ মিনিটে তিনি ম্যারাথন শেষ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়ে দিয়েছে, ইনজুরি নয়, বিশ্বাস আর ‘আমি পারব’ মানসিকতাই একজন অ্যাথলেটের আসল শক্তি। জেবার কাছে এই ঘটনা তার দৌড় জীবনের বড় পুরস্কার।

ভবিষ্যতে জেবার ইচ্ছা খেলাধুলায় যুক্ত থাকা। জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার ভাবনা থাকলেও আপাতত নিজের প্রস্তুতিকে আরও পোক্ত করতে চান। তার বিশ্বাস, ম্যারাথন শুধু শরীর নয়, মনও সুস্থ রাখে, বিশেষ করে নারীদের এই খেলায় আনতে প্রয়োজন মোটিভেশন ও ইতিবাচক যোগাযোগ।

ম্যারাথনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভোরে ইভেন্ট ভেন্যুতে পৌঁছানো, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কিংবা প্রফেশনাল অ্যাথলেটদের সঙ্গে একই ইভেন্টে দৌড়ানো সবই কঠিন। তবে এসব চ্যালেঞ্জ জেবাকে আরও দৃঢ় করেছে। দৌড়ই এখন জেবার পরিচয়। দীর্ঘ পথ, ক্লান্তি আর বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়াই তার জীবনদর্শন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দৌড়ই এখন জেবার পরিচয় 

গরমে স্বস্তি পেতে যেসব খাবার খাওয়া উচিত

দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান, ভুল বোঝাবুঝিই বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়

প্রার্থিতা ফিরে পেতে হাইকোর্টে নুসরাত তাবাসসুমের রিট

কাস্টমস কর্মকর্তা হত্যা: ছেলের প্রথম জন্মদিন কাটছে বাবা হারানো শোকে

জলাবদ্ধতা নিরসন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার