চার হাজার বিনিয়োগে পুঁজি এখন পাঁচলাখ
রঙ-তুলিই খানসামার ইতির সফলতা এনে দিয়েছে
মোজাফফ্র হোসেন, খানসামা (দিনাজপুর) : সংসার, রান্নাঘর কিংবা পর্দার আড়ালে সীমাবদ্ধ থাকা এই চিরাচরিত ধারণাকে ভেঙে রঙ আর তুলির শক্তিতে নিজের জীবন বদলে দিয়েছেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের নদীপাড়ার বাসিন্দা ইতি পাটোয়ারী। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে প্রাচ্য চিত্রকলা ও মুদ্রণ শিল্পে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করা ইতি পাটোয়ারী বর্তমানে দুই সন্তানের জননী। তিনি একটি শিক্ষক পরিবারের গৃহবধূ। তার স্বামী আফজালুর রহমান পাকেরহাট সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। সংসার, সন্তান আর কাজ সবকিছু একসঙ্গে সামলে নিজের শিল্পীসত্তাকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন তিনি।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভার-এ কাজ শুরু করেন ইতি পাটোয়ারী। তবে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সময়ানুবর্তিতা, ঘরসংসার ও সন্তানদের দেখভাল সবকিছু একসঙ্গে সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তখনই তিনি ভাবতে শুরু করেন ঘরে বসে নিজের মতো করে কিছু করার। ইউটিউব ও ফেসবুকে হ্যান্ডপেইন্ট ও হস্তশিল্পের ভিডিও দেখে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে তার সুপ্ত শিল্পীসত্তা। ছোটবেলা থেকেই রঙ ও হাতের কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাকে নতুন পথে হাঁটতে অনুপ্রাণিত করে।
২০২৩ সালের শুরুতে মাত্র চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তার উদ্যোগ ‘ইতি কথা’। কিছু কাপড়, রঙ ও প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল কিনে হাতে আঁকা কয়েকটি পোশাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া পান ক্রেতাদের কাছ থেকে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘ইতি কথা’ নামের ফেসবুক পেজ, যেখান থেকেই শুরু হয় নিয়মিত বিক্রি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চার হাজার টাকার পুঁজি আজ রূপ নিয়েছে পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসায়।
বর্তমানে তিনি মাসে আয় করছেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ইতি পাটোয়ারীর নকশায় ফুটে ওঠে আবহমান বাংলার প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও রঙের নান্দনিক ব্যবহার। হ্যান্ডপেইন্ট শাড়ি, থ্রি-পিস, ওয়ানপিস, শিশুদের পোশাক, পাঞ্জাবি, কাপল সেট ও ফ্যামিলি সেট সবই তিনি নিজ হাতে তৈরি করেন। ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষের মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে তার ডিজাইন করা কাপল ও ফ্যামিলি সেটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ইতি পাটোয়ারী সৃষ্টি করেছেন কর্মসংস্থানের সুযোগ। ইতোমধ্যে তিনি অন্তত ২৫ জন স্থানীয় নারীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের টিমে যুক্ত করেছেন। তার এই উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের কাছে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
আরও পড়ুনদুই সন্তানের জননী ইতি পাটোয়ারী এক হাতে সামলান সংসার, অন্য হাতে তৈরি করেন পণ্য এবং অনলাইনে সেগুলোর বিপণনও করেন। এই পথচলায় তার স্বামী আফজালুর রহমানের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহ ছিল বড় অনুপ্রেরণা। ইতি পাটোয়ারী বলেন, “আমার কাজগুলো কোনো কালেকশন নয়, এগুলো আমার ক্রিয়েশন।
স্বামীর সহযোগিতা না থাকলে দুই বাচ্চা নিয়ে একা কখনোই এই কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। তার সহযোগিতা আর নিজের মনোবল নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমার উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে চাই, যাতে অবহেলিত নারীরাও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়।” সমাজের অন্য নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নাটক-সিরিয়াল কিংবা মোবাইলে অযথা সময় নষ্ট না করে যদি সেই সময়টুকু সৃজনশীল কাজে লাগানো যায়, তাহলে নিজের পাশাপাশি সমাজেরও উন্নয়ন সম্ভব। মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, তা সম্ভব হয়েছে কেবল ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের কারণে। নারীরা চাইলে সবই পারে।”
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক







