ভেড়া পালন করে ভাগ্য ফিরিয়েছেন চরাঞ্চলের নারীরা
নিজের আলোয় ডেস্ক : আম্মিয়া বেগমের পরিবারে সাতজন সদস্য। দিনমজুর স্বামী রিয়াজুল ইসলাম ও দুই মেয়ে, তিন ছেলে নিয়ে তার সংসার। দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। আগে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। এখন আর সেই সমস্যা নেই।
আম্মিয়া বেগম জানান, গত বছরের শুরুতে একটি প্রতিষ্ঠান তাকে বিনামূল্যে একটি ভেড়া দেয়। ওই ভেড়া একবার চারটি বাচ্চা দিয়েছে। সেখান থেকে এখন তিনি আটটি ভেড়ার মালিক। এর মধ্যে একটি ভেড়া বিক্রি করে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন। গত ঈদে দুটি ভেড়া বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছেন। গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বালাসীঘাট। সেখান থেকে নৌকায় প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে মাইজবাড়ী চর। ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জেগে ওঠা মাইজবাড়ী চরটি গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের অন্তর্গত মাইজবাড়ী চরেই আম্মিয়া বেগমের বাড়ি।
আম্মিয়ার হাসিমুখে জানান, চরাঞ্চলের নারীরাও আধুনিক পদ্ধতিতে ভেড়া পালন শুরু করেছে। জেলার আড়াইশ জন নারী উন্নতজাতের ভেড়া পালন করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। গাইবান্ধার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফ্রেন্ডশিপের টেকসই উন্নয়নে সহায়ক প্রকল্প (এএসডি) তাদের সহযোগিতা করছে। চরাঞ্চলের নারী ও যুবকরা এই খাতে নতুন সুযোগ পাচ্ছেন। ভেড়া পালনের সঙ্গে সঙ্গে লোম থেকে শিল্পজাত সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করেছেন।
কিছুটা হলেও ংতাদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন। আম্মিয়ার সঙ্গে কথা বলতেই এগিয়ে এলেন একই চরের মোমেদা বেগম। তিনি জানালেন, দুই বছর আগে তাকেও বিনামূল্যে একটি ভেড়া দেওয়া হয়। সেই ভেড়া দুবার বাচ্চা দিয়েছে। এখন তার ছয়টি ভেড়া রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ভেড়া গর্ভবতী। খুব তাড়াতাড়ি এগুলো বাচ্চা দেবে। তখন আট থেকে দশটি ভেড়া হবে। তিনি আরও বলেন, বন্যা এলেই চরের অনেক ফসল পানির নিচে নষ্ট হয়ে যায়। তাই ভেড়া পালন লাভজনক। কারণ ভেড়ার তেমন রোগবালাই হয় না। মৃত্যুহারও কম। ভেড়া বিক্রির টাকায় দুই ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় তিন বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন।
আরও পড়ুনক্ষেতে সার ও কীটনাশকের খরচ বহন হয় ভেড়া বিক্রি করা টাকায়। এএসডি সূত্র জানায়, লুক্সেমবার্গ অর্থায়নে ২০১৭ সাল থেকে এই প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর জানুয়ারি থেকে এএসডি প্রকল্পটি জেলার চরাঞ্চলের আটটি গ্রামে কাজ করছে। এসব গ্রামের মোট আড়াইশ নারী ভেড়া পালন করছেন। গাইবান্ধা এএসডি প্রকল্প ব্যবস্থাপক দিবাকর বিশ্বাস বলেন, গাইবান্ধার চরাঞ্চলে দিন দিন ভেড়া পালন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কারণ ভেড়ার রোগব্যাধি কম। বছরে চার থেকে ছয়টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। লালন-পালনে খরচ কম। দুই থেকে আড়াই বছরে দেশীয় জাতের ভেড়া ১৮ থেকে ২৫ কেজি ওজনের হয়। যার দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এখন দেশীয় ভেড়ার সঙ্গে ভারতের উন্নত জাতের ভেড়ার কৃত্রিম প্রজনন করানো হচ্ছে। সেগুলো আড়াই বছর পর ৪০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের হবে। দাম ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। চরাঞ্চলে বন্যার কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেড়া তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ভেড়া পালন করলে দ্রুত লাভবান ও স্বাবলম্বী হওয়া যায়। খাদ্য ভালো পেলে ভেড়া স্বাস্থ্যবান হয়। ফলে ভেড়ার গর্ভধারণের হার বেশি এবং আকারে বড় হয়। পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় ৪১ হাজার ১৪১টি ভেড়া আছে। জেলার প্রায় চরাঞ্চলেই ভেড়া পালন হয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক






