মৌসুমে ফুলের দাম আকাশছোঁয়া: বসন্ত কি বিলাসিতা
বসন্ত মানেই রঙ, গন্ধ আর ভালোবাসার মৌসুম। কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা হাসি, পলাশের লাল ডাক আর হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে প্রিয় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সহজ আনন্দ এই তো বসন্তের চিরচেনা ছবি। অথচ প্রতিবছর বসন্ত এলেও সেই হাসি আজকাল কেমন চাপা থাকে। কারণ বসন্ত আছে, ফুল আছে কিন্তু ফুলের দাম ক্রমেই নাগালের বাইরে। ঢাকার শাহবাগ ফুলের দোকান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কিংবা রাজশাহীর সাহেববাজার সবখানেই একই বাস্তবতা। যে গোলাপ একসময় ১০-১৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৩০-৪০ টাকা। জারবেরা, গ্লাডিওলাস, লিলি কোনোটাই ব্যতিক্রম নয়। একগুচ্ছ ফুল কিনতেই গুনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। একজন শিক্ষার্থী কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বাড়তি চাপ। সবচেয়ে বেশি ভাঙে ফুলপ্রেমীদের মন। ফুল ভালোবাসা কোনো বিলাসিতা নয় এটি অনুভূতির ভাষা, সম্পর্কের প্রকাশ। কেউ মায়ের জন্য ফুল কিনতে চায়, কেউ বন্ধুর জন্মদিনে, কেউ বা নিঃশব্দ ভালোবাসা জানাতে। কিন্তু দাম শুনে অনেকেই নীরবে দোকান ছেড়ে চলে যান। বসন্ত তখন আনন্দের বদলে হয়ে ওঠে একরাশ হতাশা।
অন্যদিকে বিক্রেতাদের বক্তব্যও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সার, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা সময়মতো ঠান্ডা না পড়া, হঠাৎ বৃষ্টি ফুলের ফলন কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ তুলতেই বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ফুলচাষে সরকারি সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে। তবু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকেই যায় এই বাড়তি চাপ কি সবসময় ভোক্তার কাঁধেই পড়বে? বসন্ত তো শুধু ধনীদের জন্য নয়। গ্রাম থেকে শহর সবখানেই বসন্ত একইভাবে আসে। অথচ শহরের বাজারে বসন্ত যেন ধীরে ধীরে ‘লাক্সারি সিজন’-এ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন বা বিশেষ সামাজিক দিনে ফুলের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে বাড়ে। অনেকেই একে ‘সিজনাল সিন্ডিকেট’ বলছেন চাহিদা বাড়লেই দাম বাড়ানোর এক অদৃশ্য চক্র। খাদ্যপণ্যের বাজারে প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও ফুলের বাজারে তা চোখে পড়ে না। অথচ ফুলও এখন মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের অংশ। দামের চাপে ফুল না কিনতে পারলেও ভালোবাসা কমে না শুধু প্রকাশের ভাষা বদলে যায়। কেউ কাগজের ফুল বানান, কেউ ছবি আঁকেন, কেউ একটি বার্তায় অনুভূতি সেরে নেন। সৃজনশীলতার দিক থেকে এটি ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকেই যায় প্রকৃত ফুল কি তবে কেবল সামর্থ্যবানদের অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে? সমাধান অসম্ভব নয়। ফুলচাষে সরকারি সহায়তা বাড়ানো, পরিবহন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দাম অনেকটাই সহনীয় রাখা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে ফুলের বাজার গড়ে তোলা গেলে শহরমুখী চাপও কমবে। সবচেয়ে জরুরি হলো ফুলকে ‘অপ্রয়োজনীয় পণ্য’ হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা। বসন্ত কারও একার নয়। ফুলও নয়। ফুল মানে শুধু সাজ নয় এটি ভালোবাসা, প্রতিবাদ, শ্রদ্ধা ও স্মৃতির প্রতীক। যদি বসন্তে ফুলই মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই বসন্ত কি সত্যিই এখন বিলাসিতা হয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় শুধু বাজারের নয়, আমাদের সবার। কারণ বসন্ত বাঁচে মানুষের অনুভূতিতে দামের তালিকায় নয়।
লেখক :
আরও পড়ুনবুশরা আজমী
সমাজকর্ম বিভাগ, ৩য় বর্ষ, রাজশাহী কলেজ।
সহযোগী সদস্য, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিট।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








