ভয় নয়, চাই ভোটের মর্যাদা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গাড়িটা প্রায় দুয়ায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের জোর প্রচারণায় জন জীবনে কিছুটা ভোগান্তি তৈরী হলেও মানুষের উৎসাহে কোন কমতি নেই। চায়ের কাপে এখন বইছে তুমুল ঝড়। বাংলাদেশের মানুষ চায় দেশটা দুর্নীতিবাজ মুক্ত হোক। বিশেষ করে দেশের নতুন ভোটাররা দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিপরীতে ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বিশ্লেষণগুলো থেকে উঠে আসছে।
জরীপের ফলাফলগুলোই সত্য হবে এমন কোন কথা নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে ‘সুক্ষ কারচুপি’ বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে এবং প্রতিবার নির্বাচনের পরপরই এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছে, সেখানে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও যদি অতীতের মত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় তাহলে কোন জরীপের ফলই সত্য হবে না। তাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে নির্বাচন কতখানি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে। অতীতের প্রবণতা থেকে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনরা বা তাদের পছন্দের দলই অতীতে বিজয়ী হয়েছে। এবারেও যে তাই হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত হলেও অতীতে নির্বাচন কমিশনের ইচ্ছা যাই হোক সরকারের ইচ্ছা ও পরিকল্পনারই জয় হয়েছে।
কোন জরিপের ফল সত্যি, কোনটা সত্যিকার অর্থেই জনমতের প্রতিফলন তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন যে পাবে তারাই সরকার গঠন করবে। সব জরীপের ফল বলছে, মানুষ এখন ক্লিন ইমেজ তথা দুর্নীতি থেকে মুক্ত এবং জনগণের কাছাকাছি থাকেন বা জনবান্ধব প্রার্থী তাদেরই বেছে নেবেন। নারী ভোটার ও নতুন ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রেও তারাই রয়েছেন। নারী ও তরুণ ভোটাররা উগ্রতা ও সহিংসতা একদম পছন্দ করেন না। তাই এবার নতুন প্রার্থী, অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থীদের অথবা যাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোন বড় ধরণের কোন অভিযোগ নেই, এমন প্রার্থীরা এবারে জয়লাভ করার সম্ভাবনা বেশি। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ প্রার্থীর সততা ও অতীত কর্মকান্ডকে অধিক গুরুত্ব দিবে বলেই মনে হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও নির্বাচনের আগের মুহূর্তে যদি কোথাও নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দেয় তাহলে ভোটের ফলাফল বদলে যেতে পারে। নিরাপত্তার প্রশ্নে সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা প্রবল এবং দেশের সকল নির্বাচনি কেন্দ্রে তাদের সরব উপস্থিতি জনমনে আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
ভোটের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে ভোটের মাঠ ততই সরব হয়ে উঠছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে ঘোষিত হচ্ছে নির্বাচনি ইশতেহার। সাধারণতঃ সকল দলের ইশতেহারই সুলিখিত ও অঙ্গীকারে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু মানুষ আসলে ঐ ইশতেহারের চাইতে দলের নেতাদের জনসংযোগের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি এবং তাদের অতীতের কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তবু এই আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা দলিল যা দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহি করা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের দেয়া আসনভিত্তিক অঙ্গীকারগুলোকেও লিপিবদ্ধ রাখা দরকার। এখন এটা নাই কিন্তু আমার মনে হয়, আসনভিত্তিক লিখিত ইশতেহার দেয়ার বিধান থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা, কৃষক ও কৃষির বিকাশ, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রযুক্তি সহায়তা ও মিড-ডে মিলসহ আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুনিশ্চিত করা, সর্বস্তরে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সহায়তা বৃদ্ধি করা, পরিবেশ সুরক্ষার মত বিষয়গুলো আগামীর নির্বাচনে অধিক গুরুত্ব পাক, দলগুলো সেই অঙ্গীকার পূরণ করুক এটা দেশবাসী প্রত্যাশা করে। মানুষ চায় প্রতিশোধপরায়ণতা নয়, সকলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। ভয় নয়, ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান, ভোটের মাধ্যমে ভোটারদের সাথে যে চুক্তিবদ্ধতা আপনারা সৃষ্টি করছেন তা রক্ষা করবেন। কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি নয়, গুরুত্ব দিবেন জনগণের অধিকার ও মর্যাদা বাস্তবায়নে। সমতা ও নায্যতার নীতি হোক আগামীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি, বৈষম্য নয়।
আরও পড়ুনলেখক
আতাউর রহমান মিটন
কলামিস্ট ও গবেষক
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








