ভিডিও শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনের সর্বশেষ আপডেট ও ব্রেকিং নিউজ

০০ দিন
০০ ঘণ্টা
০০ মিনিট
০০ সেকেন্ড
বিস্তারিত দেখুন
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৫:০৪ বিকাল

সাওমের মাসে অনৈতিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

পবিত্র রমজানের সুগন্ধে যখন মুসলিমদের জীবনে খুশির স্রোত বয়ে চলে, ঠিক তখনই সকলের মাথায় ঢুকে পড়ে আরেক ভয়াবহ চিন্তা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। রমজান এলে অন্যান্য দেশে দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা হয়, আর বাংলাদেশে এই দ্রব্যমূল্য আরও নাগালের বাইরে চলে যায়। এতে ভুক্তভোগী হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। ইফতার ও সেহরিতে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার খেতে না পারার কারণে তাদের কর্মক্ষমতা কমে যায়, ফলে আয় হ্রাস পায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় ও মানুষের একাগ্রতা ও ত্যাগের মাসকে কেন্দ্র করে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করে নিজেদের উদরপূর্তি করতে যারা সিন্ডিকেট চালায়, তাদের প্রকৃতপক্ষে মানবিক বোধের অভাব। সরকারের দৃশ্যমান নজিরের অভাবে এই অনৈতিকতা চলমান রয়েছে কয়েক দশক ধরে। আমাদের দেশে নিম্নবিত্তদের জন্য মাঝেমধ্যে টিসিবি বা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা থাকলেও, সবচাইতে বিপাকে পড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা না পারে লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে, না পারে চড়া দামে বাজার সামলাতে। রমজানে প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় ক্যালরির চাহিদা যেখানে বেশি থাকার কথা, সেখানে আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষ খাদ্য তালিকা থেকে আমিষ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। গত বছরের এক জরিপ অনুযায়ী, বাজারে সবজির দাম বেড়েছে গড়ে ২৫%, ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২০% এবং গরুর মাংস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। যখন একটি পরিবার ইফতারি আর সেহরির নূন্যতম চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়, তখন সেই সমাজ ব্যবস্থায় ‘ন্যায্যতা’ শব্দটি একটি উপহাসে পরিণত হয়। 

পুষ্টিবিদেরা বলেন, রমজান মাস শরীরের জন্যেও উপকারী। রোজা রাখলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ভালোভাবে কাজ করে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায় ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। কিন্তু এইসব ফলাফল পাওয়া তখনই সম্ভব যখন ইফতার ও সেহরিতে ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ না করা হয় এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত পানি ও প্রোটিন গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দেশের এই শাকসবজি, ফলমূল, গুড়, প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন মুরগি, ডিম ও গরুর মাংসের দাম যে হারে বৃদ্ধি পায়, তাতে কেউই স্বাস্থ্যসচেতনতার দিকটি নিয়ে ভাবে না। বরং বাজারের কম মূল্যের ভাজাপোড়া খাবারের পেছনে ছোটে। আবার এখানেও দেখা যায় বিপত্তি। ভাজাপোড়ার জন্য তো বটেই, ভালো রান্না করতে হলে যে তেল প্রয়োজন, সেই তেল কিনতেও হিমশিম খেতে হয় ভোক্তাদের। সবথেকে দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ বেশি দাম দিয়ে যা কেনে তাতেও থাকে অত্যধিক ভেজাল। এই কোণঠাসা অর্থনৈতিক বাজারে রমজান মাস অনেকের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে।

রমজান মাস বিরত থাকার মাস। অর্থাৎ শুধু খাবার ও পানি থেকে নয়, বরং সমস্ত অনৈতিকতা থেকে বিরত থাকার মাস। কিন্তু সিন্ডিকেটের ব্যবসা অনৈতিকতার চরমে পৌঁছে গেছে। প্রায়ই শোনা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণেই দেশে দাম বেড়েছে। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম ১০% বাড়লে আমাদের দেশে তার প্রভাব পড়ে ৪০%। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। এর বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। দুবাই, কাতার বা সৌদি আরবে রমজান উপলক্ষে বড় বড় সুপারশপগুলোতে চলে ছাড়ের মহোৎসব। ব্যবসায়ীরা সওয়াবের আশায় দাম কমিয়ে দেয়। আর আমাদের দেশে রমজানকে দেখা হয় ‘এক মাসে বারো মাসের মুনাফা’ তুলে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে। এই মানসিকতা কেবল ব্যবসায়িক নীতিহীনতা নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’ বা ‘কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। ভ্রাম্যমাণ আদালত কিছু খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করে। কিন্তু যারা মূল কারিগর, সেই পাইকারি আড়তদার বা বড় আমদানিকারকদের ছুঁতে পারা যায় না। যথাযথ কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা না থাকা এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিও পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ। কিন্তু রাষ্ট্র যখন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামাতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই দায়ভার সরাসরি জনগণের কাঁধেই চাপে।

আমাদের দেশে কৃষক যে পণ্য ৫ টাকায় বিক্রি করে, হাতবদল হতে হতে তা ভোক্তার কাছে ৫০ টাকায় পৌঁছায়। বড় শহরগুলোতে সরাসরি ‘কৃষক বাজার’ স্থাপন করতে হবে, যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই কৃষক তার পণ্য বিক্রি করবে। পচনশীল পণ্যের (যেমন: টমেটো, পেঁয়াজ, আলু) জন্য সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত হিমাগার তৈরি করতে হবে, যাতে মৌসুমের বাইরেও যোগান স্বাভাবিক থাকে। আমাদের আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজার মাত্র ৮-১০টি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি। নতুন ও মাঝারি আমদানিকারকদের সহজ শর্তে এলসি খোলার সুযোগ দিতে হবে। একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির পথ খোলা রাখতে হবে। রমজান মাস আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমতের একটি মাস। এই মাসটিকে মানুষের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর না করে মানুষের এই সিয়াম সাধনাকে আরও সহজ করে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। ব্যক্তি হতে শুরু করে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিজ দায়িত্বে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু এই মাস নয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কখনোই কাম্য নয় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর দেশের নাগরিকের জীবনমানের জন্য। তাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অসততা ত্যাগ করার চর্চা হোক ন্যায়পরায়ণতা ও কঠোর প্রতিবাদের মাধ্যমে। 

আরও পড়ুন

লেখক :

লাবনী আক্তার শিমলা

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাওমের মাসে অনৈতিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

ভিজিটর ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার অনুমোদন নেই : মা‌র্কিন দূতাবাস

বিএনপির কাইয়ুমের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে নাহিদ

আরও বাড়তে পারে রাত এবং দিনের তাপমাত্রা

এপস্টেইন নথি : লম্বা, স্বর্ণকেশী সুইডিশ তরুণী চেয়েছিলেন আম্বানি

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে কষ্ঠার্জিত জয় পাকিস্তানের