শিল্পায়ন উন্নয়নের ইঞ্জিন নাকি পরিবেশের শত্রু
মানুষের ইতিহাস আসলে এক অন্তহীন অভিযাত্রা যা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, কাঁচা হাতে তৈরি যন্ত্র থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন পর্যন্ত, কাঁদামাটির কুঁঁড়েঘর থেকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা পর্যন্ত। এই যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এক শব্দ, শিল্পায়ন। এটি যেন মানুষের উন্নতির রথচক্র, সভ্যতার ইঞ্জিন। একসময় যেখানে মানুষ নদীর তীরে হাতের পরিশ্রমে জীবনধারণ করতো, আজ সেই নদী তীরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কারখানার চিমনি। মেশিনের শব্দে হারিয়ে গেছে পাখির ডাক, ধোঁয়ার ধূসরতায় ঢাকা পড়ে গেছে নীল আকাশ,তবুও মানুষ বলে এটাই অগ্রগতি। শিল্পায়ন মানবসভ্যতার অর্জন,সেই সাথে এটি এক জটিল দ্বন্দ্বের নাম। এটি যেমন আমাদের দিয়েছে কর্মসংস্থান,প্রযুক্তি, আধুনিক চিকিৎসা ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি, তেমনি কেড়ে নিয়েছে মাটি, পানি, বন, বাতাসের পবিত্রতা। একদিকে মানুষ শিল্পায়নের মাধ্যমে পৃথিবীকে জয় করেছে, অন্যদিকে সেই মানুষই তার হাতেই তৈরি করছে নিজের ধ্বংসযন্ত্র। উন্নয়নের এই পথচলা যেন দুই ধারওয়ালা এক তলোয়ার যার একদিক দেয় জীবন আর অন্যদিক সেই জীবনের ভিত্তি কেটে নেয়।
শিল্পায়নের সূচনা হয়েছিল ১৮শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইংল্যান্ডে যখন মানবসভ্যতা প্রথমবারের মতো কৃষি নির্ভর সমাজ থেকে উৎপাদনকেন্দ্রিক সমাজে রূপান্তরিত হয়। সেই সময় বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার পৃথিবীর অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির গতিপথ বদলে দেয়। কৃষিজ উৎপাদনের পরিবর্তে মেশিনভিত্তিক উৎপাদন, হাতে গোনা কর্মীর পরিবর্তে হাজারো শ্রমিকের কারখানা আর প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের পরিবর্তে মানুষের মানুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই শিল্প বিপ্লব থেকেই শুরু হয় এক নতুন যুগ, যেখানে উন্নয়ন মানে শিল্প আর শিল্প মানে ক্ষমতা। প্রথম শিল্পবিপ্লবের পরে আসে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব কিছু মিলে আজ পৃথিবী হয়ে উঠেছে এক বিশাল উৎপাদনযন্ত্র। শিল্পের বিস্তারে মানুষ জয় করেছে মহাকাশ, সাগর, পর্বত সব কিছু। কিন্তু এই জয়যাত্রা যেমন বিস্ময়ের তেমনি ভয়েরও।কারণ শিল্পায়নের প্রতিটি ধাপে প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ছে। সেই সাথে চাপের ফল এখন বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি। আজ শিল্প ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। আমরা যে কাপড় পরি, খাবার সংরক্ষণ করি, ওষুধ খাই,বাড়ি বানাই সবই শিল্পের ফসল। কিন্তু এই আরামদায়ক জীবনের প্রতিটি উপাদানের পেছনে আছে প্রকৃতির কোনো না কোনো অংশের ত্যাগ। যে মেশিন আলো দেয় তা কয়লা পুড়িয়ে, যে গাড়ি আমাদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছায় তা ধোঁয়া ছড়ায় আকাশে, যে প্লাস্টিক আমাদের জীবন সহজ করেছে তা মাটির বুক বিষে ভরিয়ে দিয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে,ঢাকা সহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বায়ু ও পানি দূষণের হার ক্রমশ বাড়ছে। ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা নদী মৃতপ্রায়। গার্মেন্ট শিল্প অর্থনীতির ভিত্তি হলেও কার্বন নিঃসরণ ও রাসায়নিক ব্যবহারে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভারতের দিল্লি, চীনের বেইজিং বা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ সব জায়গায় উন্নয়ন ও পরিবেশে ক্ষতির একই চিত্র। শিল্পায়ন কেন পরিবেশের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। অধিকাংশ শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে কৃষিজমি, বনভূমি বা নদীর তীরে যেখানে পরিবেশ মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে বর্জ্য সরাসরি প্রাকৃতিক পরিবেশে মিশে যায়। আজও পৃথিবীর প্রায় ৮০% শিল্প কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো পুড়িয়ে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ কার্বন যা বায়ুমন্ডলে জমে গ্লোবাল ওয়ার্মিং সৃষ্টি করে। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের প্রচেষ্টা থাকলেও তা এখনো যথেষ্ট নয়। আবার, অনেক শিল্প এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় যেখানে দূষণ নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এছাড়া অনেক শিল্প উদ্যোক্তা পরিবেশ সুরক্ষাকে বাড়তি খরচ হিসেবে দেখে।তারা মুনাফার জন্য পরিবেশের ক্ষতিকে তুচ্ছ মনে করে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও অনেক সময় পর্যাপ্ত মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকে না। মানুষ যত বেশি পণ্য চায়, ততো বেশি উৎপাদন হয়, আর উৎপাদন মানেই পরিবেশ দূষণ। একেকটি মোবাইল ফোন,গাড়ি বা পোশাকের পেছনে যে পরিমাণ শক্তি ও পানি ব্যয় হয় তা অচিন্তনীয়। এভাবে মানুষের চাহিদাই শিল্পায়নকে দূষণের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
শিল্পায়নকে পরিবেশের শত্রু থেকে উন্নয়নের বন্ধুতে পরিণত করতে হলে টেকসই দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োজন। শিল্পখাতে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রচলন বাড়াতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস, হাইড্রোপাওয়ার এসব নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে কারখানার জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। প্রতিটি শিল্পে বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লান্ট স্থাপন করতে হবে। নদী বা খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সাথে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহায়তা। কারণ এক দেশের দূষণ অন্য দেশের পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। যেমন-এক দেশে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড অন্য দেশে জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া পরিবেশ আইন থাকলেও তা অনেক দেশে কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা, দূষণকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা বা বন্ধ করা এসব ব্যবস্থা কার্যকর হতে হবে। পরিবেশের গুরুত্ব স্কুল পর্যায় থেকেই শেখাতে হবে। শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় এমন নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে হবে যা একই সাথে উৎপাদন বাড়াবে এবং দূষণ কমাবে। শিল্পায়নকে সম্পূর্ণ শত্রু বলা অন্যায় কারণ এটি আমাদের সভ্যতার ইঞ্জিন। কিন্তু অন্ধ শিল্পায়ন যেখানে প্রকৃতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই সেটিই বিপজ্জনক। প্রকৃতি আমাদের জীবনধারণের মূল আর শিল্প হলো জীবনের সুবিধা। সত্যিকার উন্নয়ন হলো এমন উন্নয়ন যা বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটায় কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা নষ্ট করে না। তাই শিল্পায়নের লক্ষ্য হতে হবে টেকসই অগ্রগতি, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি সহাবস্থানে বেঁচে থাকে। আমরা যদি আজ থেকেই সচেতন হই, দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখি, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করি এবং পরিবেশকে অর্থনীতির সমান মর্যাদা দিই তাহলে শিল্পায়ন সত্যিই হবে উন্নয়নের ইঞ্জিন, ধ্বংসের নয়। শিল্পায়ন হোক উন্নয়নের ইঞ্জিন, কিন্তু পরিবেশের শত্রু নয়। প্রকৃতির বন্ধু হয়ে উঠুক মানবতার হাতিয়ার।
লেখক :
আরও পড়ুনআরমীন আমীন ঐশী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








