বেগম খালেদা জিয়া : এক রাজনৈতিক ধ্রুবতারার মহাকাব্যিক জীবনচিত্র
বেগম খালেদা জিয়া। একটি অনবদ্য রাজনৈতিক চরিত্রের নাম। একটি সংগ্রামের নাম। একটি আবেগের নাম। তিনি তাঁর সংগ্রামের সমান বড়, কেননা তিনি জীবনভর দেশটাকে ধারণ করেছেন, ভালবেসেছেন, আগলে রেখেছেন। বেগম জিয়াকে নতুন করে পরিচয় দেয়ার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। তবুও বলতেই হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আশির দশক থেকে আমৃত্যু তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতির এক অনন্য চরিত্র। চব্বিশের ৩৬ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণের এই কালেও ছিলেন দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যর মধ্যমণি। তিনি শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরাকাষ্ঠা, অথচ ফ্যাসিবাদী অন্যায়-অপবাদ-জুলুম-নির্যাতনের শিকার। তিনি আমাদের প্রেরণা। তিনি গোলামির জিঞ্জির ভাঙতে সংকল্পবদ্ধ এক সংগ্রামী, এক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অগ্নিকণ্ঠ ও গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। তিনি বাংলাদেশ জাতি-রাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক।
ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রগণ্য করেছেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখন্ডের সুরক্ষা নিশ্চিতে এবং স্বৈরাচার, সামরিক শাসন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক ডামাডোল, বিদেশী প্রভুত্ববাদের বেড়াজাল, অপশাসনের নাগপাশ থেকে বের হয়ে আসার লড়াই-আন্দোলন-সংগ্রাম, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা দুর্নীতি, ক্ষমতার দাপটে থাকা কিংবা আড়ালে আবডালে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতিমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা, দুঃশাসনের বেড়াজাল ভাঙতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন নীতি গ্রহণ, নেতৃত্বের মত জগদ্দল পাথর বা গুরুভার বোঝা তিনি ভালোমতোই সামলেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
এরপর আরো দুবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সামলেছেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক দল সর্বশেষ সরকার গঠন করেছিলেন ২০০১ সালে। কূপমন্ডুকতার বাহিরে এসে এবং গড্ডলিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে তিনি প্রশাসনিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে বেগম জিয়ার কেবিনেট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকীকরণ, সাক্ষরতার হার বাড়ানো, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি। বেকারত্ব দূরীকরণে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। মানবসম্পদ রপ্তানিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসীদের কল্যাণী নিরলস কাজ করেছেন। এসবই দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল ও প্রচ্ছন্ন দৃষ্টান্ত। এরপরেও দেশের ভগ্নপ্রায় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেশ কিছু কাজের, কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেগুলোর সফল সমাপ্তি আলোর মুখ দেখেনি। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির জটিল মঞ্চে পা রেখেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। হয়েছিলেন বিএনপির মত রাজনৈতিক দলের সভানেত্রী, জায়গা করে নিয়েছিলেন সবার মনের মনিকোঠায়। এই মহীয়সী মহাপ্রয়াণকে স্মরণীয় করে রাখতে, তাঁর কয়েক দশকের সুদীর্ঘ পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামী পথচলা ও কর্মজীবনের বিভিন্ন যুগান্তকারী পর্বের ওপর আলোকপাত করে দেশব্যাপী স্থিরচিত্র ও প্রামাণ্যচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন প্রাণের সংগঠন বগুড়া মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি-ঢাকা। প্রাথমিক পর্যায়ে বেগম জিয়ার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১২টি জেলায় এই প্রদর্শনী চলেছে জানুয়ারি মাসব্যাপী। ইতোমধ্যে ঢাকা, দিনাজপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা, বগুড়া, সিলেট, রাজশাহী, ফেনী, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে প্রদর্শনী হয়েছে। এখন চলছে এই ইভেন্টের সমাপনী প্রদর্শনী পর্যটন নগরী কক্সবাজারের কলাতলী পয়েন্টে।
উল্লেখ্য, গত মাসের শুরুতে রাজধানীর জিয়া উদ্যান ও পরবর্তীতে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন পার্কেও বেগম জিয়াকে নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। দর্শনার্থীদের অভূতপূর্ব সাড়ায় সাহাবুদ্দিন পার্কে বসে ওই দিনেই সংগঠনের উপদেষ্টা ও আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক জৈষ্ঠ সাংবাদিক আতিকুর রহমান রুমন ভাই বৈঠকে বসেন সংগঠনের উপদেষ্টা ও দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সভাপতি মারুফা রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সুজন মাহমুদের সাথে। এই প্রদর্শনী করার সিদ্ধান্ত নেন আটটি বিভাগীয় শহর ও বেগম জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত তিনটি জেলা ও সর্বশেষ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। লজিস্টিক সাপোর্ট দেন লালু ভাইয়ের করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিস।
এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আপামর জনসাধারণ তথা নতুন প্রজন্মের কাছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অবদান তুলে ধরাই সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কর্মকান্ডে তাঁর অংশগ্রহণ, বিভিন্ন বিদেশী অতিথি বা মেহমানের সাথে তাঁর মিটিং-সিটিংয়ের ছবিও এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী এই প্রদর্শনী সিরিজে উপস্থিত ছিলেন ও আগ্রহভরে ঘুরে ঘুরে ফ্রেমে বন্দি বেগম জিয়ার ছবিগুলো দেখেছেন। স্বাক্ষর করেছেন শোক বইয়ে, প্রকাশ করেছেন তাদের আবেগ-অনুভূতি ও করেছেন স্মৃতিচারণ। তারা লিখেছেন বেগম জিয়ার অত্যন্ত সৎ ও সাদাসিধা মানুষ ছিলেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি অত্যন্ত সফল ও সার্থক।
এই আপসহীন কণ্ঠস্বরের জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে এক জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকের রাজনৈতিক স্বর্ণযুগের পরিসমাপ্তি ঘটে গেল ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ। আজ বেগম জিয়া আর কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন। আজ তিনি ইতিহাস। আজ তিনি শুধুই স্মৃতি। তবে তিনি আমাদের জাতীয় স্মৃতির ক্যানভাসে অটুট, অমলিন, অম্লান ও ভাস্বর হয়েই থাকবেন অনন্তকাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। আসুন, আমরা এই মহিয়সী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
আরও পড়ুনলেখক :
এম আমিনুল ইসলাম
সাংবাদিক
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
বগুড়া মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি- ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








