ভিডিও বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৪:৫৬ দুপুর

মাদক চোরাচালান : সীমান্ত অঞ্চলে অদৃশ্য নেটওয়ার্ক

সীমান্ত মানেই শুধু কাঁটাতার, পাহারা আর পতাকার গল্প নয়। সীমান্ত মানে নীরবতা, অদৃশ্য চলাচল আর ছায়ার ভেতর গড়ে ওঠা এমন এক নেটওয়ার্ক, যার শেকড় রাষ্ট্রের ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত। দিনের আলোয় সীমান্ত শান্ত, কিন্তু রাত নামলেই শুরু হয় অন্য এক রাষ্ট্রহীন অর্থনীতি, মাদক চোরাচালান। বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্তরেখা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। এই সীমান্ত শুধু ভৌগোলিক সংযোগ নয়, এটি হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় মাদক রুটের অংশ। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নানা প্রকারের মাদক প্রবেশ করছে দেশে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে? কারা জড়িত? আর কেন এই নেটওয়ার্ক এতটা অদৃশ্য? 

বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলের বড় অংশ নদী, চর, পাহাড় ও দুর্গম বনাঞ্চলে ঘেরা। কাঁটাতারের ফাঁক, শুকনো নদীর বুক, পাহাড়ি ট্রেইল; সবকিছুই মাদক চোরাচালানকারীদের জন্য স্বর্গ। সীমান্তের বহু এলাকায় জনবসতি এত কাছাকাছি যে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের আড়ালেই ঘটে যায় অপরাধ। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি সীমান্ত এবং পশ্চিমাঞ্চলের নদীঘেরা অঞ্চলগুলোতে নজরদারি দুর্বল। রাতের আঁধারে ছোট নৌকা, মোটরসাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটেই বহন করা হয় মাদক। বড় কোনো গাড়ি বা অস্ত্র লাগে না, লাগে শুধু স্থানীয় পথচেনা মানুষ। মাদক চোরাচালানকে আমরা প্রায়ই সীমান্তে ধরা পড়া বাহকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা এই বিশাল নেটওয়ার্কের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। এই নেটওয়ার্কের স্তরগুলো কয়েকধাপে সাজানো থাকে: উৎপাদন ও উৎস পর্যায়, ট্রানজিট ও সংরক্ষণ, বিতরণ, অর্থনৈতিক ম্যানেজমেন্ট। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই নেটওয়ার্কের শীর্ষে থাকা মানুষগুলো কখনো ধরা পড়ে না। তারা সীমান্তে থাকে না, মাদক বহন করে না। তারা থাকে শহরের অভিজাত এলাকায়, বৈধ ব্যবসার আড়ালে। সীমান্ত এলাকার বহু মানুষ বছরের পর বছর অবহেলিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে। এই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয় চোরাচালান সিন্ডিকেট।  এক রাতের বাহক হিসেবে ৫-১০ হাজার টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি যা একজন শ্রমিকের এক মাসের আয়ের সমান। ফলে অনেকেই ঝুঁকি নেয়। তারা জানে ধরা পড়লে জীবন শেষ, তবু বিকল্প নেই। এখানেই রাষ্ট্র ব্যর্থ, কারণ যেখানে রাষ্ট্র নেই, সেখানে অপরাধই রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। 

সীমান্তে দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলো চেষ্টা করছে, এটা অস্বীকার করা যায় না। নিয়মিত অভিযান, আটক, মামলা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা কাঠামোগত। সীমান্ত দীর্ঘ, জনবল সীমিত, প্রযুক্তিগত নজরদারি অপর্যাপ্ত, স্থানীয় সোর্স অনেক সময় ভয়ের কারণে মুখ খুলতে চায় না, দুর্নীতির অভিযোগ পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কিছু অসাধু সদস্যের কারণে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার সুযোগ নেয় মাদক সিন্ডিকেট। সীমান্তে ঢুকে পড়া মাদক শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় শহরের অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বস্তি ও অভিজাত ক্লাব পর্যন্ত। এর ফল তরুণ প্রজন্মের আসক্তি, অপরাধ বৃদ্ধির হার, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়সহ আরো নানা পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা। একটি ইয়াবা বড়ি শুধু একজনকে নয়, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে। আর হাজার হাজার বড়ি মিলে ধ্বংস করে একটি সমাজ। মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে হলে কেবল সীমান্তে অস্ত্রধারী পাহারা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন: সীমান্ত অঞ্চলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর উন্নয়ন। আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙা অর্থাৎ হুন্ডি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ বন্ধ। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি; ড্রোন, সেন্সর, স্মার্ট বর্ডার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, ব্যবহারকারীকে অপরাধী নয়, রোগী হিসেবে দেখা। 

মাদক চোরাচালান কোনো একক অপরাধ নয়, এটি একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা। সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে আমাদের চোখ খুলতে হবে, শুধু বন্দুক নয় নীতি, মানবিকতা ও জবাবদিহির শক্তি নিয়ে। কারণ সীমান্ত যদি অরক্ষিত থাকে, তবে শহর কখনো নিরাপদ থাকে না।

আরও পড়ুন

 
লেখক

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দিপু দাসের লাশ পোড়ানোয় নেতৃত্ব দেওয়া ইয়াছিন আরাফাত গ্রেফতার

ঘন কুয়াশায় ৫০ বরযাত্রী নিয়ে পথ হারানো যাত্রীদের সেনাবাহিনীর মানবিক সহায়তা 

‘মসজিদ-কবরস্থান’ ধ্বংসে ১৭ বুলডোজার, রণক্ষেত্র দিল্লি

চতুর্থ দিনে ১৭৪ আপিল ইসিতে

ঢাবির শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদী হল’ করার সুপারিশ

এবার পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান কিনতে চায় সৌদি আরব