দেশের স্বার্থে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করুন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কৃষি, নির্মাণ, রপ্তানিমুখী শিল্প, পরিষেবা এবং নির্মাণ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অনিয়ম, শর্তাবলি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং অসাধু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নানা জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নিয়োগের নিয়মাবলি পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত এজেন্সি, এবং দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ একটি শ্রমবহুল দেশ। প্রতিবছর প্রায় ২০–২৫ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ চাকরির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। তাদের নির্মাণ, কৃষি, রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প ও পরিষেবা খাতে বিপুল সংখ্যক অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। মালয়েশিয়ার প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন বলে ধারণা করা হয়, যদিও প্রকৃত সংখ্যাটি তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
মালয়েশিয়ায় যাওয়া শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেন, তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে, প্রতিশ্রুত বেতন ও কাজ মেলেনি, এমনকি সেখানে গিয়ে জেলেও পড়েছেন অনিয়মের কারণে। এই ভোগান্তির পেছনে মূলত রয়েছে : দালাল চক্র: বাংলাদেশে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে। কেউ কেউ ৩–৫ লাখ টাকার বেশি খরচ করছেন একটি ভিসার জন্য। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব: একাধিক সংস্থা, অননুমোদিত এজেন্সি এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ায় প্রক্রিয়াটি জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক জটিলতা: মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেও ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট জটিলতা, কঠোর কোটাপদ্ধতি এবং নিয়োগের শর্তাবলি অস্পষ্ট হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে পুনরায় সমস্যা দেখা দেয়। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ান সরকার শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে এবং নিয়োগ সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এরপর ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ান সরকার ঘোষণা দেয়, তারা ‘মুক্ত প্রতিযোগিতা’ ভিত্তিতে বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা চায়। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আগের সেই ২৫টি এজেন্সির পক্ষেই অবস্থান নেয়া হচ্ছে, যা মালয়েশিয়ার অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, একদিকে মালয়েশিয়ার চাহিদা থাকলেও, বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘ হলে তা রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি। বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রবাসীদের কাছ থেকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পায়, যার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মালয়েশিয়া থেকে। এই রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনে এবং সামাজিক উন্নয়নের সহায়ক হয়।যদি মালয়েশিয়া শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়, তাহলে: লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান হারাবে। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলো দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়বে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাবে।
করণীয় ও সুপারিশ: শর্ত মেনে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা: মালয়েশিয়ার যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত শর্ত মেনে দ্রুত শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে উভয় দেশেরই উপকার হবে। রেফারেল বা খোলা প্রতিযোগিতা ভিত্তিক নিয়োগ চালু করা: সকল বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দিলে একচেটিয়া দুর্নীতির অবসান হবে। দালালমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা: স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় দেশের প্রতিটি জেলায় শ্রমিক রেজিস্ট্রেশন, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। সরকারি পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি: বিদেশগামী শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, ভিসা ও চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে সরকারিভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দূতাবাসের সক্রিয়তা: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসকে শ্রমিকদের পাসপোর্ট, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তা আরও গতিশীল করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি: বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদি শ্রমচুক্তি করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে একতরফা স্থগিতাদেশ না আসে।
আরও পড়ুনমালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি শ্রমবাজার নয়, এটি একটি রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনৈতিক স্তম্ভ। এই বাজারে সমস্যা তৈরি হলে তার অভিঘাত পড়বে হাজার হাজার পরিবার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই সরকার, নিয়োগ সংস্থা ও দূতাবাসকে একযোগে কাজ করে মালয়েশিয়ার দেওয়া যৌক্তিক শর্ত মেনে দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত লাভ নয়, দেশের স্বার্থ, সাধারণ জনগণের কল্যাণ এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
লেখক
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








