মানবিকতার উষ্ণতা ছড়িয়ে দিন
বাংলাদেশে শীত মানেই এক ভিন্ন বাস্তবতা। কারও কাছে শীত আনন্দের-নতুন পোশাক, পিঠা-পায়েস, উৎসব আর ছুটির আমেজ। আবার কারও কাছে শীত মানেই দুঃস্বপ্ন-খোলা আকাশের নিচে কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই, অনাহার, অসুস্থতা আর অনিশ্চিত জীবনের বোঝা। এই বৈপরীত্য আমাদের সমাজের এক নির্মম সত্য তুলে ধরে। শীতকাল তাই শুধু ঋতু পরিবর্তনের সময় নয়, মানবিক দায়িত্ব পালনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, পার্ক কিংবা গ্রামের খোলা মাঠ-এসবই গৃহহীন মানুষের ঘর। শীতের রাতে যখন তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে যায়, তখন তাদের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত গরম পোশাক বা কম্বল না থাকায় তারা সারারাত জেগে থাকে, শরীর কাঁপে, ঠান্ডায় জমে আসে হাত-পা। অনেক সময় আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের জন্য শীত আরও ভয়ংকর। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি কিংবা ত্বকের সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় সাধারণ রোগও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। প্রতিবছর শীতকালে ঠান্ডাজনিত কারণে গৃহহীন মানুষের মৃত্যুর খবর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, কিন্তু শীত কেটে গেলে সেই স্মৃতি অনেক সময়ই ম্লান হয়ে যায়। গৃহহীনতা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবার ভেঙে যাওয়া কিংবা স্বাস্থ্যগত জটিলতা-নানান কারণে মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। অনেকেই দিনমজুর, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা বা ভাসমান শ্রমিক। শীতকালে কাজের সুযোগ কমে যায়, আয় অনিশ্চিত হয়। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও পোশাকের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই মানুষগুলো সমাজেরই অংশ, অথচ তারা প্রায় অদৃশ্য। আমাদের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই তাদের পাশ কাটিয়ে চলি। কিন্তু একটি সভ্য সমাজের পরিচয় এখানেই-সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির পাশে দাঁড়াতে পারা। শীতকালে গৃহহীনদের সহায়তা শুধু দয়া নয়, এটি জীবন রক্ষার কাজ। একটি কম্বল কারও জন্য বিলাসিতা হলেও আরেকজনের জন্য তা হতে পারে বেঁচে থাকার অবলম্বন। গরম খাবারের একবেলা তাদের শরীরে শক্তি জোগায়, মনে আশার আলো জ্বালায়। সহানুভূতির একটি কথা, একটু যত্ন-এগুলো তাদের আত্মসম্মানও ফিরিয়ে দেয়।
মানবিক সহায়তা সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তখন সহমর্মিতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়। এই সংস্কৃতিই দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য কমাতে সহায়ক। গৃহহীনদের পাশে দাঁড়ানো কোনো কঠিন কাজ নয়। ইচ্ছা থাকলেই ছোট ছোট উদ্যোগ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পরিষ্কার, ব্যবহারযোগ্য পুরোনো কম্বল বা শীতের পোশাক দান করা যেতে পারে। অনেক সময় নতুন পোশাক না হলেও চলবে-উষ্ণতা আর পরিচ্ছন্নতাই মূল বিষয়। শীতের রাতে এক কাপ গরম চা, খিচুড়ি বা স্যুপ গৃহহীনদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। স্থানীয়ভাবে রান্না করে বা দলবদ্ধভাবে খাবার বিতরণ করা যায়। অনেক সামাজিক সংগঠন শীতকালে গৃহহীনদের জন্য কাজ করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলে সহায়তা আরও পরিকল্পিত ও কার্যকর হয়। কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল বা ফাঁকা সরকারি ভবন শীতের রাতে অস্থায়ী আশ্রয় হতে পারে-এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ জরুরি।
গৃহহীন মানুষদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। তারা করুণার পাত্র নয়, সম্মানের দাবিদার মানুষ। অন্যদের সচেতন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গৃহহীনদের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালীন আশ্রয়কেন্দ্র, বিনামূল্যে চিকিৎসা, কম্বল বিতরণ কর্মসূচি এসব উদ্যোগ নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি, যাতে মানুষ স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সমাজের বিত্তবান শ্রেণি, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানবিকতার উষ্ণতাই হতে পারে আসল সমাধান। শীতের ঠান্ডা প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতা সেই ঠান্ডাকে হার মানাতে পারে। গৃহহীনদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু তাদের সাহায্য করা নয়-নিজেদের মানবিকতাকেও জাগিয়ে তোলা। আজ আমরা সাহায্য করলে, আগামীকাল একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে। এই শীতে আসুন, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বকেও গুরুত্ব দিই। ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষটির জন্য একটি কম্বল, একটি খাবার বা একটি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ শীত কেটে যাবে, কিন্তু মানবিকতার উষ্ণতা রয়ে যাবে চিরকাল।
লেখক
আরও পড়ুনমাহফুজা খাতুন
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








