ভূমিকম্পে সচেতনতাই শেষ ভরসা
কয়েক মাস আগে সাতবারেরও বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের অবস্থান সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময় থাকে। মিয়ানমারের আরাকান মেগাথ্রাস্ট অঞ্চল, সিলেট-মেঘালয় ফল্ট ও ডাওকি ফল্ট, এসব এলাকাতেই মূল চাপ জমে থাকে এবং গবেষকরা নিয়মিত সতর্ক করে আসছেন যে এসব অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘন ঘন কম্পন সেই টেকটোনিক চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রস্তুতির অভাব। বহু ভবন এখনো ভূমিকম্প সহনশীল কাঠামো অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ভবনগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা, সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এসব মিলিয়ে ঝুঁকি আরও বাড়ে। জনগণের আচরণগত ভুলও বিপজ্জনক। কম্পন শুরু হলে অনেকে দৌড়াদৌড়ি করে, সিঁড়ি বা লিফটে নামার চেষ্টা করে, জানালার পাশে দাঁড়ায় এই সবই আঘাতের প্রধান কারণ। তাই আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ানো বা অবস্থা বুঝে উঠার আগে বের হওয়ার চেষ্টা নয়, বরং নিরাপদ ভঙ্গিতে অপেক্ষা করাই সবচেয়ে জরুরি। এ অবস্থায় সচেতনতা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই। প্রথমত, পরিবার পর্যায়ে জরুরি পরিকল্পনা থাকা জরুরি নিরাপদ স্থানের মানচিত্র, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাগ, জরুরি ফোন নম্বর হাতের নাগালে রাখা উচিত। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর ও তাৎক্ষণিক সুরক্ষাব্যবস্থা হলো বিশ্বস্বীকৃত প্রোটোকল “ড্রপ, কভার, হোল্ড অন”।
প্রথমত ড্রপ অর্থাৎ ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত হাঁটু ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। এতে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। দ্বিতীয়ত কভার অর্থাৎ মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখতে হবে, দুই হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে মজবুত টেবিল বা ডেস্ক থাকলে তার নিচে ঢুকে পড়তে হবে। কোনো আসবাবপত্র না থাকলে জানালা, কাঁচ বা ভারী সামগ্রী থেকে দূরে গিয়ে ভিতরের দেয়ালের পাশে বসে থাকা উত্তম। তৃতীয়ত হোল্ড অন অর্থাৎ অবস্থান ধরে রাখতে হবে। যে অবস্থানেই থাকুন না কেন সেটাকে শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। টেবিলের নিচে থাকলে সেটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা, কারণ কম্পনের সময় এটি নড়ে যেতে পারে। টেবিল না থাকলে সুরক্ষিত ভঙ্গিতে মাথা- ঘাড় ঢেকে কম্পন পুরোপুরি থামা পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখা উচিত। দৌড়াদৌড়ি, সিঁড়ি, বা লিফটে নামার চেষ্টা থেকে এই তিন ধাপই ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে নিরাপদ বলে স্বীকৃত।
অতিরিক্ত আতঙ্ক না করে, সঠিক প্রস্তুতি ও নিরাপদ আচরণই জীবন বাঁচায়। পাশাপাশি, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড আগেও সতর্কবার্তা পাওয়া গেলে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে, বাংলাদেশেও দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভূমিকম্প প্রতিরোধ সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক আচরণ, প্রস্তুতি এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও সঠিক প্রস্তুতিই জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
আরও পড়ুনলেখক
কারিশমা ইরিন
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








