মাহমুদা তাসমিহ্
সাগরের তলদেশে যুদ্ধ: অপটিক্যাল ফাইবার ও ইন্টারনেট দখল
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধরন বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধ এখন আর শুধু স্থল, আকাশ কিংবা সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সমুদ্রের তলদেশে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল। এসব ক্যাবলের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে ইন্টারনেট ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। তাই এগুলো এখন অনেক দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
আমরা প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা বলি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি এবং অনলাইনে নানা কাজ করি। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ সমুদ্রের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। এসব ক্যাবল কাচের সূক্ষ্ম তন্তুর মধ্য দিয়ে আলোর সাহায্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করে। আন্তমহাদেশীয় ডিজিটাল যোগাযোগের সিংহভাগই এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ক্যাবলে বিঘ্ন ঘটলে শুধু ইন্টারনেট নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সরকারি ডিজিটাল সেবাও প্রভাবিত হতে পারে।
এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব দ্রুত বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে।তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বিভিন্ন দেশ সমুদ্রতলের যোগাযোগ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো দেশের ইন্টারনেট যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং কার্যক্রম, অনলাইনভিত্তিক সেবা এবং সরকারি তথ্য আদান প্রদান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এসব ক্যাবলকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বা আঞ্চলিক সংঘাতের সময় এ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।সাবমেরিন ক্যাবল বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজের নোঙর, মাছ ধরার কার্যক্রম, ভূমিকম্প ও পানির নিচে ভূমিধসের কারণে ক্যাবল ছিঁড়ে যেতে পারে।
ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করার আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগর অঞ্চলে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। তবে প্রতিটি ঘটনাকে নাশকতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প সংযোগের ওপর চাপ বাড়ে, যোগাযোগের গতি কমতে পারে এবং সেবার খরচ বাড়তে পারে। সমুদ্রের গভীরে ক্যাবল শনাক্ত ও মেরামত করাও সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। তাই দুর্ঘটনা ও ইচ্ছাকৃত ক্ষতির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি।বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং ও ব্যবসা-বাণিজ্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাবমেরিন ক্যাবলে বড় সমস্যা দেখা দিলে ব্যবহারকারী ও প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়তে পারে। অনলাইনভিত্তিক কাজে যুক্ত তরুণদের আয় ও কর্মপরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাও ব্যাহত হতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে বলে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগবিভ্রাটের প্রভাব ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।ঝুঁকি কমাতে শুধু সাবমেরিন ক্যাবলের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সংযোগের সক্ষমতা বাড়ানো, বিকল্প পথ নিশ্চিত করা এবং একটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও অন্য সংযোগ দিয়ে জরুরি সেবা চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো পথে সমস্যা হলে অন্য পথে কতটা তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব, তা আগেই যাচাই করা জরুরি। সরকারি সেবা, ব্যাংকিং ও জরুরি যোগাযোগ সচল রাখতে কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনা থাকা দরকার। পাশাপাশি ক্যাবল মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত সরঞ্জাম এবং সমন্বিত পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে হবে।
আরও পড়ুনবাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সমুদ্রতলদেশীয় ক্যাবল পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সংকটের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। এ ছাড়া সংকটের সময় কোন সংযোগ কতটা কার্যকর থাকবে তা নিয়মিত মহড়া ও ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমবে।সমুদ্রের তলদেশে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না, অথচ বিশ্বের বহু দেশের দৈনন্দিন যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম এর ওপর নির্ভরশীল। তাই এ অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে অবহেলা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর প্রস্তুতি, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কারণ, তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হওয়া মানে শুধু যোগাযোগে বিঘ্ন নয় অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি হওয়া।
সুতরাং সমুদ্রের গভীরে থাকা এই নীরব যোগাযোগ পথের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1792818060.jpg)
_medium_1792663066.jpg)
_medium_1792662207.jpg)
_medium_1792565260.jpg)
_medium_1792564196.jpg)
_medium_1792477722.jpg)
_medium_1792823374.jpg)

