নিশাত স্নেহা
ময়না তদন্তে নারী ডোম নিয়োগের আবশ্যকতা
মৃত্যুর পরও মর্যাদার অধিকার। জীবিত অবস্থায় একজন নারী নিজের শরীর, শালীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার রাখেন। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই মর্যাদা ও গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে? বিশেষ করে অপমৃত্যু, দুর্ঘটনা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের প্রয়োজন হলে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ময়নাতদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এর প্রয়োজন রয়েছে। তবে একটি আইনগত ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াও মানবিক হতে পারে। মৃত নারীর দেহের ময়নাতদন্তে প্রশিক্ষিত নারী ডোম বা নারী মর্গ সহকারী থাকলে তার শারীরিক গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার সুযোগ আরও বাড়ে। মৃত্যুর পর একজন মানুষ নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন না; তাই তার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব জীবিত সমাজের। সমস্যাটা কোথায়? বাংলাদেশের অনেক মর্গে নারী মর্গ সহকারীর সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ফলে মৃত নারীর দেহ ব্যবস্থাপনা ও ময়নাতদন্তের প্রস্তুতিতে নারী কর্মীর উপস্থিতি সব সময় নিশ্চিত করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মর্গের নিরাপত্তা, অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং মৃতদেহের গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্ন।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ঘটনায় মর্গ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মৃত নারীর মর্যাদা নিয়ে উদ্বেগ সামনে এসেছে। এমনকি মৃত নারীর মরদেহের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের অভিযোগে মর্গ সহকারী গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা ব্যতিক্রমী হলেও মর্গের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। বাস্তবতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত : নারী মৃতদেহের ময়নাতদন্তে নারী মর্গ সহকারী নিয়োগের বিষয়টি এখন নীতিগত আলোচনাতেও এসেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ বিষয়ে হাইকোর্টের রুল বিষয়টিকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। আদালতের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দেয় যে মৃত নারীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা কেবল পারিবারিক অনুভূতির বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আরও পড়ুনকীভাবে সমাধান করা যায়? প্রথমত, প্রতিটি ময়নাতদন্তকারী হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নারী মর্গ সহকারী নিয়োগ করতে হবে। নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মর্গে অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ডোম পেশাকে সামাজিকভাবে অবহেলিত না করে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-আইনগত সহায়ক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারী ও পুরুষ—উভয় ধরনের প্রশিক্ষিত কর্মীর সমন্বয়ে একটি পেশাদার মর্গ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। ময়নাতদন্ত হোক প্রয়োজনীয়, কিন্তু অমানবিক নয়; বৈজ্ঞানিক, কিন্তু মর্যাদাহীন নয়। মৃত মানুষ নিজের সম্মানের দাবি জানাতে পারেন না—তাই তার শেষ মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। নারী ডোম নিয়োগের মাধ্যমে মর্গ ব্যবস্থাপনাকে আরও মানবিক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1792477722.jpg)
_medium_1792476067.jpg)
_medium_1792390384.jpg)
_medium_1792388571.jpg)
_medium_1792218325.jpg)
_medium_1792216729.jpg)
_medium_1792564196.jpg)

