ভিডিও শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪৭ পিএম

রাহমান ওয়াহিদ

বায়োগ্যাস: একটি সম্ভাবনাময় জ্বালানি খাত

বায়োগ্যাস: একটি সম্ভাবনাময় জ্বালানি খাত

দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, যানবাহন চলাচল, সেচপাম্প চালানো, মিল কারখানা, বাসাবাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সহজলভ্য এলপিজি গ্যাসের ঘাটতিও কখনো কখনো জ্বালানির এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তোলে। ফলে একদিকে যেমন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের উন্নয়ন। 

এ সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান দিতে পারে বায়োগ্যাস। বায়োগ্যাস হলো এমন এক শক্তি, যা বিভিন্ন জৈব পদার্থের পচনের ফলে নির্গত মিথেন গ্যাস। গবাদি পশুর গোবর, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে এ গ্যাস উৎপন্ন হয়। বায়োগ্যাসে ব্যবহৃত অবশিষ্ট অংশ জৈব সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করা হয়, যা য, যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। বিশ্বের অনেক দেশে জ্বালানি কাঠ এবং বন উজাড় হওয়া রোধ করতে অনেক আগে থেকেই গরুর গোবর ও গৃহস্থালীর বর্জ্য থেকে জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাসের প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও বাংলাদেশে এর প্রচলন শুরু হয়েছিল বেশ দেরিতে।

পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (ইপিসিডি) ১৯৮০ সালে বায়োগ্যাস প্রযুক্তিটিকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার দায়িত্ব নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় দুশোটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ও আরেকটি বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ পরিবার ও পোল্ট্রি ডেইরি খামারীদের ভর্তুকি ও ঋণ সুবিধা দিয়ে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে বিপ্লব নিয়ে আসে। বায়োগ্যাসের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে সারা দেশে লক্ষাধিক বায়োগ্যাসের প্লান্ট স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু এই জনপ্রিয়তায় ধস নামলো ১৯৭৮ সালের দিকে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসির অধীনে এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের প্রচলন ও উৎপাদন শুরু হয়। শহর ও উপশহরে সহজলভ্য, বহনযোগ্য ও তাৎক্ষণিক ব্যবহারের সুবিধার কারণে সিলিন্ডারের গ্যাস দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে বায়োগ্যাসের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেও এর প্রয়োজনীয়তা কমপ্যাক্ট বায়োগ্যাস সিলিন্ডার জনপ্রিয়তা পেয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে এখনও চালু না হলেও এ ধরনের বহনযোগ্য বায়োগ্যাস সিলিন্ডার এ দেশে তৈরি ও বাজারজাতকরণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ৭-৮ সদস্যের একটি কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বরং খরচ সাশ্রয়ের কথা ভেবে এলপিজি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে এলপিজির সিলিন্ডারের মতো সহজে ও স্বল্প খরচে বায়োগ্যাস বিফিল করার আধুনিক ব্যবস্থা এবং বহনযোগ্য প্লান্ট ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে ভারতের কেরালা রাজ্যে। মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে গোবর থেকে তৈরি প্রথম বহনযোগ্য পরিবারের জন্য ৩ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। এই প্লান্টটি স্থাপনের জন্য ২৫০ সেন্টিমিটার ব্যাসের এবং ২২০ সেন্টিমিটার গভীরতার একটি ডাইজেস্টার বা কূপই যথেষ্ট। 

আরও পড়ুন

প্রতিদিন এই সাইজের প্লান্টের জন্য ৪০ থেকে ৫০ কেজি গরুর গোবর বা একই পরিমাণ হাঁস মুরগীর বিষ্ঠা ও সমপরিমাণ পানি (১: ১ অনুপাতে) পাইপের মাধ্যমে দিতে হবে। বাড়িতে ৩-৫টি গরুর মাঝারি আকারের খামার থাকলে নিয়মিত উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে। এতে বায়ো-ডাইজেস্টার গর্ত, গ্যাস হোল্ডার, ইনলেট আউটলেট এবং ভালো মানের পাইপলাইন ও বার্গার যুক্ত করা হলে তৈরি হওয়া গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী একটি পারিবারিক বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ করতে ৪০-৫০ হাজার টাকা লাগতে পারে। একটি সূত্র বলছে-দেশে থাকা প্রায় ৪৩ কোটি গবাদি পশু থেকে প্রতি বছর ১২৪.১৫ মিলিয়ন টন গবাদি পশুর বর্জ্য তৈরি হয়, যা দিয়ে বিপুল পরিমাণ বায়োগ্যাস ও প্রাকৃতিক সার উৎপাদন সম্ভব। ঋণ সুবিধা দিয়ে হলেও ছোট ছোট বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণকে উৎসাহিত করতে পারেন সরকার। 

গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ গবাদিপশুর খামার ও পোলট্রি ফার্মের বর্জ্য উৎপাদিত হয় সেগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশে ৪০ লাখ বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় ধরনের ল্যান্ডফিল বা বর্জ্যের ভাগাড় রয়েছে। এসব ভাগাড়ে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টন বর্জ্য জমা হয়। পত্র-পত্রিকার খবরে প্রকাশ-অনেক দেরিতে হলেও ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে চীনের একটি কোম্পানি। প্রকল্পটি চালু হলে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে। মাতুয়াইলেও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলে এই দুটি বড় বর্জ্যের ভাগাড় থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। শহরাঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালী বর্জ্য, কাঁচাবাজারের পচনশীল আবর্জনা ও পোল্টি বর্জ্য জমা হয়, সরকারি নীতিমালার আওতায় সেগুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সংগ্রহ করে উপযুক্ত জায়গায় ছোট ছোট বায়োগ্যাস প্লান্ট উৎপাদন করে পাইপের মাধ্যমে আশে পাশের বাসাগুলোতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেই গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শহরগুলো পরিচ্ছন্ন হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। 

লেখকঃ কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট
০১৭১১-০৫৫২৮১

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বায়োগ্যাস: একটি সম্ভাবনাময় জ্বালানি খাত

৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে ইন্দোনেশিয়া

বগুড়া সিটি সাংস্কৃতিক শিল্পী গোষ্ঠীর নতুন কমিটি গঠন

রাজা হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে ফুটবলকেই বেছে নিলেন ডেসমন্ড

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নারী-শিশু নির্যাতন মুছে দিতে কাজ করবে মহিলা দল: রিজভী