মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোই হোক রাজনীতির ভিত্তি
রাহমান ওয়াহিদ : ক্ষমতা অনেক ধরনের। তবে অস্তিত্বের প্রশ্নে মানুষের ক্রয় ক্ষমতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। কারণ এ ক্ষমতাটি মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সাথে ও দেশের উন্নয়নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। উন্নয়ন হলে উৎপাদন ও সেবামূলক কাজ বাড়ে। মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কাজের বিনিময়ে সন্তোষজনক বেতন/মজুরি পেলে মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার বা সেবা পাওয়ার ক্ষমতা অর্থাৎ ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে। এই ক্রয় ক্ষমতা বাড়লেই কেবল জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়।
বিগত বছরগুলোতে যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, সেবামূলক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে, পারিবারিক ব্যয় বেড়েছে, সেভাবে কিন্তু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি। বেকারত্বের হার কমেনি। বাজারে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যের লাগাম টেনে ধরা যায়নি। কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসেনি। ফলে খাদ্যসহ নিত্যপণ্য, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় সেবা ইত্যাদি কিনতে গিয়ে ভীষণভাবে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে, এমনকি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছেন, পড়ছেন নির্দিষ্ট আয় বা স্বল্প আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ। সরকারের পর সরকার এসেছে, মন ভরানোর স্বপ্ন দেখিয়েছে কিন্তু নিদেনপক্ষে দু'বেলা খেয়ে পরে একটা স্বস্তিময় জীবনের প্রত্যাশা আজো অধরাই রয়ে গেছে তাদের।
শাসক মহল থেকে প্রায়ই দাবি করা হয়েছে যে-পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে তো মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও বেড়েছে। মানুষের কেনাকাটা বেড়েছে, ভোগ বিলাস বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতার সাথে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ার এই কথিত বয়ান আদৌ কি মেলে? মানুষের ক্রয় ক্ষমতা তো সেটাই,যা দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য রাখেন। আছে কি সেটা? বিভিন্ন সংস্থার হিসাবমতে দেশে প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি মানুষ পরোক্ষ-অপরোক্ষ বেকার। বেকারের কি কোন ক্রয় ক্ষমতা থাকে? থাকে না। দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈষম্যও। শহরে বড় বড় শপিং মল বাড়ছে, রাস্তাঘাট প্রশস্ত হচ্ছে, বড় বড় অবকাঠামো গড়ে উঠছে ঠিকই। কিন্তু সেই সঙ্গে তো বাড়ছে টিসিবির পণ্য সংগ্রহের লাইনও। বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। কমছে টাকার মূল্যমান।
একটি পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ সালে ১০০ টাকার যে ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তা মূল্যস্ফীতির কারণে কমে এখন ৪৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত দশ বছরে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি বাড়েনি। শ্রমজীবি ও নিম্ন আয়ের মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, এমনকি চিকিৎসা খাতেও তাদের বাজেট কমিয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস এর সর্বশেষ ওয়েলফেয়ার মনিটরিং সার্ভের অনুসন্ধান রিপোর্ট
বলছে-আঠারো কোটি মানুষের দেশে কোনভাবে দিন পার করছেন ৫ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ। দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী- এমন মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিতের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর সাথে বেকারের সংখ্যা যুক্ত হলে ক্রয় ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা তিন থেকে চার কোটি মানুষের বেশি তো হয় না। তার মানে মোটা দাগে দেশের চার ভাগ মানুষের মধ্যে তিন ভাগ মানুষেরই প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন-দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লাগামহীন দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার, প্রশাসনিক অদক্ষতা, বাজার তায়া ব্যবস্থাপনাকে শক্তভাবে পরিচালনা করতে না পারা ও বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার পাশাপাশি চলমান রাজনীতিও মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে দুর্বল করার জন্য কম দায়ী নয়। স্বাধীনতার পর থেকে রাজনীতিকদের বড় একটি অংশের মধ্যে রাজনীতিকে জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতা ভোগ ও তা স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে ধরে রাখার অশুভ প্রবণতা থাকায় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। জনকল্যাণের জায়গাটি দখল করেছে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থ। গোড়া থেকেই চলে আসছে দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা কামানোর জনস্বার্থ বিরোধী অপতৎপরতা। তাতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জনকল্যাণমুখী না হয়ে ব্যক্তি বা দলের
সুদৃষ্টি লাভের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বর্তমানের জনবান্ধব সরকারকে দীর্ঘদিনের এই দেশ বিরোধী অচলায়তন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের খেয়াল রাখতে হবে যে-একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয় বরং ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার ওপর নির্ভর করে। সরকারকে লক্ষ করতে হবে-নিত্যপণ্যের মূল্য এখনও অধিকাংশ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। চিকিৎসা সেবা ব্যয়বহুল, স্বাস্থ্য খাত বিপর্যস্ত। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য লাগামহীন। বিগত এক দশক ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা বাড়েনি। অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের পেনশন সুবিধা বাড়েনি। সেক্ষেত্রে শুধু সরকারি চাকুরিজীবিদের আয় বাড়ালেই হবে না, যারা বেসরকারিভাবে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাদের আয় বৃদ্ধির দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। সঠিকভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। মূল্যস্তর ঠিক রাখতে হবে। বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্ম সংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা খাতেও আর্থিক বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে তার সুফল পৌঁছে দিতে হবে। তবেই মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে। বিপুল সম্ভাবনার এই দেশে সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। তাই ক্ষমতা ভোগ নয়, জনগণের কল্যাণ ও তাদের আর্থিক সক্ষমতা তথা ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোই হোক রাজনীতির মূল ভিত্তি-এটাই প্রত্যাশা।
লেখকঃ কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট ০১৭১১-০৫৫২৮১
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








