কত দূর গড়াবে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সংঘাত?
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সীমান্তে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে কার্যত যুদ্ধাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে, যখন আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী একাধিক সামরিক পোস্টে হামলা চালায়। তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা ১৯টি পাকিস্তানি সামরিক পোস্ট এবং দুটি ঘাঁটি দখল করেছে এবং এতে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। এই হামলাকে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উল্লেখ করেছে কাবুল।
এর কয়েক ঘণ্টা পরই পাকিস্তান পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসলামাবাদ জানায়, ‘অপারেশন গাজব লিল-হক’ নামে পরিচালিত এই অভিযানে ২৭৪ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছে। একইসঙ্গে পাকিস্তান জানিয়েছে, তালেবানের হামলায় তাদের ১২ সেনা নিহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ ও নিরাপত্তা সংকটের ফল। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তান তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানকে আশ্রয় ও সমর্থন দিচ্ছে। এই সংগঠনটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নিয়মিত হামলা চালায়।
International Crisis Group-এর এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা সামিনা আহমেদ বলেন, পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আফগানিস্তানের মাটি থেকে যদি তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়, তাহলে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তিনি তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতায় দ্রুত আলোচনার আহ্বান জানান।
দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম কারণ ডুরান্ড লাইন সীমান্ত। প্রায় ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান তা মানে না। আফগানিস্তানের দাবি, এটি ঔপনিবেশিক আমলে আরোপিত একটি অবৈধ সীমানা, যা পশতুন জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করেছে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে সীমান্তে সংঘর্ষ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৭৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে।
আরও পড়ুনআন্তর্জাতিক মহলও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। United Nations-এর মহাসচিব Antonio Guterres সহিংসতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, রাশিয়া ও চীন সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এসব দেশ উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
সামরিক শক্তির দিক থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা, আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনীর জনবল দুই লাখের কম এবং তাদের বিমান সক্ষমতা সীমিত।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা আপাতত কম হলেও সীমান্তে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানো গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে আফগানিস্তান জানিয়েছে, তারা আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এই সংঘাত বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক








