মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা
২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ১৯৪০ সালে শেরেবাংলা ফজলুল হক কর্তৃক পেশকৃত লাহোর প্রস্তাবের অন্তরালে যে স্বাধীন বাংলার বীজ রোপণ করা হয়েছিল সেই বীজের প্রথম অঙ্কুরোদগম ঘটে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দেশ ভাগের পর রাজনৈতিক ভাবে ইতিহাসের নিকৃষ্টতর নোংরা রাজনীতির অন্যতম অধ্যায় মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন। মায়ের মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত করতে হয়েছে রাজপথ, বহু প্রাণের বিনিময়ে এই ভাষা আন্দোলন যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এবং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা আছে কিন্তু আজ চুয়াত্তর বছর পরেও মায়ের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে আমাদের ভাবনার আকাশে ঘন কালো মেঘের আচ্ছাদন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই বায়ান্ন থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবি অদ্যাবধি বিদ্যমান। ভিনদেশী কোনো দেশ কিংবা শক্তি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কোনো ভুমিকা রাখছে না, অথচ আমরাই আমাদের মাতৃভাষাকে প্রতি পদেপদে বিকৃতি করছি, করছি কলঙ্কিত। বর্তমান সমাজে নিজেকে উচ্চ শিক্ষিত ও অতি আধুনিকতার নামে আমরা নিজেরাই কথোপকথনের সময় বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ভিন্ন এক ভাষার জন্ম দিচ্ছি যা মজা করে অনেকেই বাংলিশ ভাষা হিসেবে নামকরণ করেছে। এই বাংলিশ ভাষার ব্যবহার শুধু বড়দের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে ছোট্ট শিশু স্কুল অবধি এখনো যায়নি তাদের মাঝেও লক্ষণীয়। আমরা অভিভাবকরা কোমলমতি শিশুরা বাংলিশ ভাষা বলায় বেশ গর্ববোধ করি, আর ভাবি আমাদের সন্তানরা আধুনিক যুগের যুগোপযোগী সন্তান।
বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা জানা প্রয়োজন তাই খুব ভালো ভাবে আয়ত্ত করতে হবে আর এই আয়ত্ত করতে যেয়ে আমরা নিজেরাই বাংলা ও ইংরেজি ভাষার সংমিশ্রণে আজব এক ভাষায় কথা বলছি যা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাভাষা কে করছি কলঙ্কিত। বিনোদন জগত বিশেষ করে টেলিভিশন নাটক, টিভি উপস্থাপনা, টকশো, সেমিনার, অফিস আদালত, পারস্পরিক কথোপকথন সর্বত্র এই বাংলিশ ভাষার যাঁতাকলে দূষিত হচ্ছে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা ভাষা। আরো বেশি আশ্চর্য হতে হয় যখন দেখি টেলিভিশন টকশোতে মাতৃভাষার মর্যাদা নিয়ে আলোচনা সভায় সম্মানিত আলোচক বৃন্দ বাংলিশ ভাষায় কথা বলে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদক্রমে গোটা পৃথিবীতে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ইত্যাদি ব্যবহার গরীব মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণির মাঝে ব্যপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কে অস্বীকার করবার কোনোই উপায় নাই। এই বিষয়ে আমাদের দেশ পিছিয়ে নেই বরং বিশ্বের অনেক দেশ থেকে এগিয়ে আছে। এখানেও মহা বিপত্তি বাংলা ভাষাকে ইংরেজি ভাষায় লিখতে গিয়ে অস্বাভাবিক ও বিকৃত ভাষার অবতারণা করছি, অথচ মোবাইলে সব ধরনের সুবিধাই আছে যা দিয়ে পরিষ্কার ভাবে আমরা বাংলা ভাষা লিখতে পারি। উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা যারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করে সেইসব পরিবারে ছোট বেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের নিকট থেকেই বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণে কথা বলা এই অভ্যাসটা তৈরি হচ্ছে যা মোটেও শোভনীয় নয়। অথচ ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবিতে আমরা সোচ্চার হই, আলোচনা ও লেখালেখি করি, দাবি করে বক্তব্য রাখি। আমরা লোকদেখানো সচেতন হওয়ার নাটক করি ঠিকই কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। মাতৃভাষায় মর্যাদা রক্ষায় অন্তত একটি বারের জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি, সবাই এই আন্দোলনে মনে প্রাণে গ্রহণ করি, সারা বছর না হোক অন্তত এই একটি মাস আমরা নিজের কাছে নিজেরাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই বাংলা ইংরেজির মিশ্রণে কোনো কথা বলবো না। ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ সহ যে কোনো কথোপকথনে ইংরেজি ও বাংলা ভাষাকে একত্রিত করে কিছু বলবো না, লিখবো না, খাঁটি বাংলা ভাষায় কথা বলবো ও লিখবো, যেখানে ইংরেজি প্রয়োজন সেখানেই শুধু ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করবো, আর যেখানে বাংলা ভাষা প্রয়োজন সেখানে শুধুই খাঁটি বাংলা ভাষায় কথা বলবো। ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত যে কোনো অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে কথোপকথনের সময় মাঝে মধ্যে বাংলা শব্দ উচ্চারণ সমগ্র অনুষ্ঠানটি যেমন হাস্যরসে পরিণত হবে ঠিক একই ভাবে বাংলা ভাষায় পরিচালিত যে কোনো অনুষ্ঠানে বাংলা কথার মাঝে ইংরেজি কথা হাস্যকর হওয়ারই কথা। বাংলায় কথা বলা নিজে, পরিবার ও সমাজে ছোট বড় সকলের মাঝে এই অভ্যাসটা অন্তত এই একটা মাস অবশ্যই মেনে চলার চেষ্টা করবো। বলাতো যায় না এই এক মাসের চেষ্টাই হয়তোবা পরবর্তীতে সফলতার মুখ দেখাতে পারে। আসুন মাত্র একবার একটু চেষ্টা করে দেখি, বিগত দিনে আমাদের অনেক স্বর্ণাক্ষরে লেখা গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রাখা ইতিহাস আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ন্যায়ের পক্ষে এমন কোনো কাজ নেই যা বাঙালি জাতি অতীতে করেনি, সেই অতীত ঐতিহ্য থেকেই এবারের মাতৃভাষা দিবসের মাসে দাবি হোক সর্বত্র সম্মানিত হোক মাতৃভাষা, সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হোক রাষ্ট্র ভাষা বাংলা ভাষা।
লেখক
আরও পড়ুনশাব্বীর পল্লব
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
মন্তব্য করুন









