থাইল্যান্ডে গণভোটে নতুন সংবিধানের পক্ষে রায়, নির্বাচনে ভূমজাইথাইয়ের নিরঙ্কুশ জয়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুল। এর মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করলেন তিনি। তার নেতৃত্বাধীন ভূমজাইথাই পার্টির এই বিজয়ে দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘাতের মধ্যে আনুতিন আকস্মিক নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয়তাবাদী আবেগ চরমে ওঠার সময়টিকে কাজে লাগাতেই রক্ষণশীল এই নেতা নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করেছিলেন। পরে এই কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়। কম্বোডিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে জনতাবাদী পেউ থাই পার্টির প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আনুতিন দায়িত্ব নেন। এরপর ১০০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি সংসদ ভেঙে দেন এবং নতুন নির্বাচনের ডাক দেন।নির্বাচনে জয়ের পর আনুতিন বলেন, ‘আজকের এই জয় কেবল ভূমজাইথাই পার্টির নয়, আপনি আমাদের ভোট দিন বা না দিন এটি সব থাই নাগরিকের জয়। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে থাই জনগণের সেবা করতে চাই।’প্রায় ৯৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাবে দেখা যায়, ভূমজাইথাই পার্টি পেয়েছে প্রায় ১৯২টি আসন। প্রগতিশীল পিপলস পার্টি পেয়েছে ১১৭টি এবং একসময় প্রভাবশালী পেউ থাই পার্টি পেয়েছে ৭৪টি আসন। রয়টার্সের হিসাবে, বাকি কয়েকটি দল মিলে ৫০০ আসনের সংসদে মোট ১১৭টি আসন পেয়েছে।
এর আগে গত ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে দেয়ার সময় আনুতিন বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর দ্বন্দ্ব ও অকার্যকর পরিস্থিতির কারণে সংখ্যালঘু সরকার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।ভূমজাইথাই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নির্বাচনী ফল বলছে, দলটি এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এমনটাই মনে করেন ব্যাংককভিত্তিক থাইল্যান্ড ফিউচার থিঙ্ক-ট্যাংকের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাপোন জাতুস্রিপিতাক। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ভোক্তাদের জন্য ভর্তুকি কর্মসূচি চালু এবং সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত কম্বোডিয়ার সঙ্গে করা একটি চুক্তি বাতিল।তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো এমন একটি সরকার আসতে যাচ্ছে, যার কার্যকরভাবে দেশ শাসনের মতো যথেষ্ট ক্ষমতা থাকবে। এটি এক ধরনের সুবিধাভিত্তিক জোট, যেখানে টেকনোক্র্যাট, রক্ষণশীল অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিকরা একসঙ্গে এসেছেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, আনুতিনের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তার জাতীয়তাবাদকে সামনে আনা এবং গ্রামাঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর রাজনীতিকদের নিজের দলে টানার কৌশল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাথিস লোহাতেপানন্ত বলেন, ‘এই মাত্রার জয় প্রত্যাশিত ছিল না। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিবেশ এবং রক্ষণশীল ভোটারদের একত্রিত করতে পারাই ভোট তাদের পক্ষে গেছে।’
ভোট গণনার সময় পিপলস পার্টির নেতা নাত্থাফং রুয়াংপানিয়াওয়ুত স্বীকার করেন, সব ভোট গণনা শেষ না হলেও তার দল জয়ের পথে নেই বলেই মনে হচ্ছে। তিনি জানান, তার দল ভূমজাইথাই নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেবে না, তবে আলাদা কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী জোটও গঠন করবে না। তিনি বলেন, ‘ভূমজাইথাই যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে আমাদের বিরোধী দলে বসতে হবে।’
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে কাঠামোগত সংস্কারের বার্তা নিয়ে প্রচারে নেমে পিপলস পার্টি শুরুতে বেশিরভাগ জনমত জরিপে এগিয়ে ছিল। তবে প্রচারণার শেষ সপ্তাহে পরিচালিত এবং রোববার প্রকাশিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জরিপে পূর্বাভাস দেয়া হয়, ভূমজাইথাই ১৪০ থেকে ১৫০টি আসন পেয়ে এগিয়ে থাকবে, যেখানে পিপলস পার্টি পেতে পারে ১২৫ থেকে ১৩৫টি আসন।
আরও পড়ুনম্যাথিস লোহাতেপানন্ত বলেন, এর আগে আনুতিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করাই পিপলস পার্টির বড় কৌশলগত ভুল ছিল। এতে দলটির আদর্শিক অবস্থান দুর্বল হয় এবং ক্ষমতাসীন থাকার সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে ভূমজাইথাই।
রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নাত্থাফং বলেন, এই ফলকে তিনি তার দলের ভুল হিসেবে দেখছেন না। বরং প্রতিপক্ষরা অনেক বেশি সক্রিয় ছিল বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো তৃণমূলে আরও মনোযোগ দেয়া। আমরা অনেক কিছু করেছি, কিন্তু তারা যা করেছে, তা ভাঙতে পারিনি। সেটুকু যথেষ্ট ছিল না।’
এদিকে রোববার সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে গণভোটও হয়েছে। নির্বাচনের পাশাপাশি হওয়া এই গণভোটে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনীর প্রণীত সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হবে কি না। সমালোচকদের মতে, ওই সংবিধান অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত শক্তিশালী সিনেটের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিল।
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক গণনায় দেখা গেছে, প্রায় দুই-এক ব্যবধানে ভোটাররা নতুন সংবিধানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
১৯৩২ সালে পূর্ণ রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত ২০টি সংবিধান প্রণীত হয়েছে, যার বেশির ভাগই সামরিক অভ্যুত্থানের পর এসেছে। নতুন সরকার ও সংসদ সদস্যরা সংসদে সংশোধনী প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। তবে নতুন সংবিধান চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য আরও দুটি গণভোট প্রয়োজন হবে।
মন্তব্য করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
_medium_1770557268.jpg)







_medium_1770578131.jpg)