কারিগরি শিক্ষা দুর্বল, শিল্পখাত পিছিয়ে সংকটে দেশ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিল্প খাতের দক্ষ জনশক্তির সংকট। এই সংকট কেবল কর্মসংস্থান ব্যবস্থার দুর্বলতার ফল নয়; বরং পুরো শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল নীতি এবং সামাজিক মনোভাবের বহুমাত্রিক সমন্বয়। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার ঘাটতি শিল্প খাতের উৎপাদন ক্ষমতাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও বহু প্রতিষ্ঠান দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না যা শিল্পায়নের জন্য এক বড় বাধা।
সমাজে এখনো একটি প্রচলিত ভুল ধারণা বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষা যেন “দ্বিতীয় শ্রেণির” শিক্ষা। এই মানসিকতার কারণেই পলিটেকনিক বা ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার কম থাকে। অধিকাংশ পরিবার তাত্ত্বিক বা সাধারণ শিক্ষাকেই সম্মানজনক মনে করেন, অথচ বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রের দ্রুত পরিবর্তিত চাহিদা বলছে ভবিষ্যতের আসল শক্তি হলো দক্ষতা, কেবল সার্টিফিকেট নয়। বাস্তবতা হলো, দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়মুখী হলেও খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা বেছে নেয়। ফলে একদিকে বাজারে দক্ষ কর্মীর অভাব থাকে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক ডিগ্রিধারী তরুণ চাকরির সুযোগ না পেয়ে বেকার থাকেন। এই ‘চাহিদা ও যোগানের অমিল’ পুরো শ্রমবাজারকে অকার্যকর করে তুলছে। শিল্প খাতের নিয়োগদাতারা প্রায়ই অভিযোগ করেন প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী পাওয়া কঠিন। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে প্রযুক্তিবিদ আনেন; এতে ব্যয় বাড়ে, আবার দেশীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন তার শিল্পখাতে নিজের তরুণরাই নেতৃত্ব দেয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ছবি উল্টো যেখানে কাজ আছে সেখানে দক্ষ কর্মী নেই, আর যেখানে তরুণ আছে সেখানে দক্ষতার ঘাটতি। কারিগরি শিক্ষা শুধু যান্ত্রিক দক্ষতা অর্জন নয়; এটি সমস্যা সমাধান, হাতে-কলমে আত্মবিশ্বাস অর্জন, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়। উন্নত বিশ্ব এ বিষয়টি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। তাদের ৫০-৬০% শিক্ষার্থী কারিগরি পথে যায়, অথচ বাংলাদেশে এই হার এখনো মাত্র ১৪-১৫% এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
কারিগরি শিক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার মূল শুরু হয় শিক্ষাক্রম থেকে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম এখনো পুরনো; বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যখন বিশ্ব automation, robotics, digital manufacturing এর দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীরা এখনো বহু বছর আগের পাঠ্যসূচি শিখছে। ফলে তারা হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন করতে পারে না, যা তাদের কর্মক্ষেত্রে টিকতে বাধা সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যোগ হয় শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গতির অভাব। বাজার চায় দক্ষ হাত, কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন স্নাতক যারা বাস্তব কাজে পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে একদিকে দক্ষতার ঘাটতি, অন্যদিকে ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই সংকট আরও গভীর হয় দক্ষ শিক্ষক স্বল্পতার কারণে। TVET সেক্টরে শিক্ষক হতে প্রয়োজন শিল্প-অভিজ্ঞতা, হালনাগাদ জ্ঞান এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষকই এসব সুবিধা পান না। পাশাপাশি পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কারিগরিশিক্ষায় রয়েছে জাতীয় মানদন্ড NVQF (National Vocational Qualification Framework)। কোন দক্ষতা কোন লেভেলের হবে, শিল্পের চাহিদা কী এসব নির্ধারণ করে এই কাঠামো। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এর সঠিক প্রয়োগ নেই। ফলে প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীর দক্ষতা শিল্প খাতের প্রত্যাশার সঙ্গে অমিল থেকে যায়। অর্থায়নের সংকটও বড় বাধা। কারিগরি প্রযুক্তি, ল্যাব, যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার, আধুনিক প্রশিক্ষণ সবকিছুই ব্যয়সাপেক্ষ। যথাযথ অর্থায়ন ও গবেষণার সুযোগ কম থাকায় সেক্টরের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গবেষণা ছাড়া উদ্ভাবন সম্ভব নয়। এদিকে Brain Drain আরেকটি গভীর ক্ষতি। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা, প্রকৌশল বা উচ্চ প্রযুক্তির শিক্ষা শেষে শিল্পখাতে কাজ না করে প্রশাসনিক চাকরিতে ঝুঁকে পড়ে। তাদের মেধা প্রশাসনে কাজে লাগলেও, দেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা গবেষণায় তার প্রভাব পড়ে না। ফলে আমাদের শিল্প খাত প্রকৃত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
দুই দিকের সংকট দক্ষতার অভাব এবং প্রতিভার অপচয় শিল্প খাতের উন্নয়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অথচ যদি কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে আনা যায়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যায়, আধুনিক TVET ব্যবস্থা চালু হয়, NVQF প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং শিল্প–শিক্ষা সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে তাহলে দেশের দক্ষতা–সংকট দ্রুতই কমে আসবে। কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা মানে উন্নয়নকে পিছনে ঠেলে দেওয়া। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে দক্ষতার প্রতি সম্মান, বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিল্পমুখী মানবসম্পদ উন্নয়নই হতে পারে অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। তরুণরা হবে দক্ষ, শিল্প হবে শক্তিশালী এভাবেই বাংলাদেশ সক্ষম হবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে।
আরও পড়ুন
লেখক
জিনিয়া তাবাসসুম
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








