অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম
কাঁচা মানে বাঁচা
প্রবন্ধের শিরোনাম দেখে হয়তো অনুভব হবে যে, আমি আবেগ, উচ্ছ্বাস ও আনন্দের বশীভূত হয়ে লিখছি; তা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জার্নালে উদ্ধৃতি হয়েছে যে, ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট তথা বাংলাদেশ নাকি ক্যাপিটাল অব ডায়াবেটিস। শিক্ষিত সচেতনগণের জানা, ডায়াবেটিস কোনো জীবানু আক্রান্তের ফলে একক কোনো ব্যামার নয়। ডায়াবেটিস মানবদেহের মেটাবলিজম, অ্যানাবলিজম তথা দেহের জটিল যন্ত্রসমূহের সম্পর্কের কার্যকারিতার ব্যত্যয়, যা জীবনাচরণ এবং খাদ্যাভ্যাসেই মুখ্য চিকিৎসা। কিন্তু আমাদের ধারণা, ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন বা ট্যাবলেট/পিল খেয়ে রোগটিকে বন্ধ রাখা বা সেরে যাওয়ার আশা করা হয়। দৈহিক যন্ত্র বিকলতায় বা অকর্মণ্যতায় ডায়াবেটিস নামক রোগ হয়ে থাকে, মোটাদাগে তা হচ্ছে- ১) ক্যালরি, ২) ফ্যাটি লিভার, ৩) লিকি গাট, ৪) নার্ভাস সিস্টেম।
১) ক্যালরি: ক্যালরি মানে শক্তি, যা দ্বারা দেহযন্ত্র জ্বালানি পায় এবং পরিচালন/সেবা উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে। ক্যালরি নামক শক্তির মূল উৎস- ক) ভাত, রুটি, আলু- কার্বোহাইড্রেট/সুগার; খ) মাছ, মাংস, ডিম, ডাল- অ্যামিনো অ্যাসিড/প্রোটিন; গ) ঘি, বাটার, উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ তেল, ডিম- ফ্যাট/স্নেহ; ঘ) বাঁচা উদ্ভিজ্জ নানা রংয়ের খাবার- ভিটামিন, ফাইবার (ছোবড়া/আঁশ), ঙ) বিভিন্ন মাত্রায় খনিজ উপাদানযুক্ত খাদ্য এবং পানি। জ্বালানির এই মোটা দাগে পাঁচ প্রকারের উপাদানের মধ্যে ‘ঘ’ এবং ‘ঙ’ এর স্বল্পতা এবং ‘ক’ নম্বর উপাদান কার্বোহাইড্রেট/শর্করার প্রাচুর্যতা মানে বেশি ভক্ষণ/গ্রহণ করা হলে সেক্ষেত্রে দেহের অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) থেকে যে ইনসুলিন জন্ম নেয়, তা বাহক হিসেবে মানবদেহের যে কোটি কোটি সেল (প্রায় ত্রিশ ট্রিলিয়ন), সেই সেলের দরজার চাবি হিসেবে ইনসুলিনকে গণ্য করা হয়। সেল দরজার চাবি খুলে ইনসুলিন গ্লুকোজ এবং ফ্যাট নামক খাদ্য/শক্তিকে সেলের মধ্যে প্রবেশ করায়। এই প্রবেশ করানোর সুযোগ যদি ইনসুলিন না পায় অথবা বেশিমাত্রায় ইনসুলিন প্রয়োজন হয় (ইনসুলিন রেজিস্টেন্স-আইআর) অর্থাৎ সেলগুলো শারীরিক শক্তি ব্যয় করে বা হাঁটাচলা করে যদি খালি না হয়, তবে ইনসুলিন গ্লুকোজকে সেলে এবং ফ্যাটকে মস্তিষ্কে পাঠাতে পারে না; সুগার রক্তেই থেকে যায়। এজন্য ক্যালরি বা শক্তি ক্ষয় করা, বার্ন করার জন্য কায়িক পরিশ্রম শুধু আবশ্যকই নয়, অত্যাবশ্যক।
২) ফ্যাটি লিভার: হ্যাভি ফুড মানে বেশি খাদ্য খেলে হ্যাভি গ্লুকোজ জন্ম হয়, যেখান থেকে ফ্যাটি লিভারের সূত্রপাত হয়। ফ্যাটি লিভার হলে ইনসুলিন সিগন্যালিং সিস্টেম ডিজঅর্ডার হয়। কলিজা থেকে এলডিএল নামক কোলেস্টরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি হয়। বাংলাদেশের মতো অল্প উন্নত দেশেও নাকি শতকরা ৫০ জনের বেশি ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। ক্যালরি ক্যাটাগরির ৫ পদের মধ্যে ১ থেকে ৪ নম্বর পদের খাদ্য শরীরে অব্যবহৃত থাকলে এবং রক্তে পরিমাণের চেয়ে সুগার (অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট) থাকলে ফ্যাটে পরিণত হয়ে কলিজা/লিভার নামক মূল্যবান অঙ্গে জমা হয়ে এই অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত করে এবং প্রয়োজনীয় হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। অপরপক্ষে কর্টিসল নামক অপ্রত্যাশিত হরমোন/কেমিকেল নিঃসরণ করে প্যানক্রিয়াসের ইনসুলিন উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করে। তখন শক্তি কোষে পৌঁছে দেওয়ার বাহনগুলোও থাকে না। এজন্য শক্তি ক্যাটাগরির ‘ঘ’ নম্বর খাদ্য ফাইবারের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ডাক্তারের কাছে ঘুরে ঘুরে ঔষধ গ্রহণ করে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে ঔষধ অপেক্ষা খাদ্য এবং জীবনাচরণই প্রকৃত ঔষধ ।
৩) লিকি গাট : লিকি গাট অর্থাৎ শরীরের ইসোফেগাস/ফেডাস থেকে কোলন পর্যন্ত প্রায় ৩০ ফুট দীর্ঘ পরিপাকতন্ত্র/গাট সিস্টেমে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন মাইক্রো অর্গানিজম/মাইক্রোব আছে, যার মধ্যে উপকারী মাইক্রোব এবং অপকারী মাইক্রোব দুইটাই আছে। উপকারী মাইক্রোবের নৈতিক গুণ ও নির্লোভতা বেশি। অপকারী মাইক্রোবগুলো লোভী, উগ্র, তাই তারা গাটের দেওয়াল ছিদ্র করে সুগার আধিক্য রক্তের দিকে যায়। ফলে গাট দুর্বল হয়, বদহজম হয় এবং সামগ্রিকভাবে শারীরিক অসাড়তা ও দুর্বলতার জন্ম নেয়। দুর্বল দেহের লিভার, অগ্ন্যাশয়, মস্তিষ্ক, কিডনি, ফুসফুস সবগুলোই প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে, অকর্মণ্য হয়। অকর্মণ্য মানুষ ইবাদত-বন্দেগী, বিশেষ করে ফরজে আইনের হক্কুল ইবাদ যেখানে শারীরিকভাবে সংশ্লেষ হতে হয়, তা দেখে ভয় পায়; ফরজে আইনের হক্কুল্লাহ্ শারীরিক কসরতমুক্ত ইবাদত করতে আগ্রহী হয়। তাই সকল ধর্ম মতে বলা আছে কর্মই ধর্ম। শ্রমকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য সুদ হারাম। দেহ, মন ও মস্তিষ্ক ব্যবহার না করে শুধুমাত্র টাকার বিপরীতে বেশি টাকা নেওয়ার নামই সুদ। টাকার বিপরীতে টাকা না নিয়ে বিনিয়োগকৃত টাকার পেছনে শারীরিক কসরত ক্যালরির ৫ পদের শক্তিকে ব্যবহার করে, বান করে বিনিয়োগকৃত টাকা অপেক্ষা কিছু বেশি টাকা পেলে তাকে সুদ নয়, লাভ বা মুনাফা বলা হয়।
৪) নার্ভাস সিস্টেম: নার্ভাস সিস্টেম মানে স্নায়ুতন্ত্র যার মোটর সেন্টারের নাম মস্তিষ্ক/ব্রেন। প্রত্যেক মানুষের নার্ভাস সিস্টেমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ক) সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম: সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম মানে অশান্ত স্নায়ুতন্ত্র, যা ভয়, রাগ, অত্যাভিলাস, অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা, অতিলোভ, টেনশন/স্ট্রেস ইত্যাদির ফলে ফাইটিং এবং ফ্লাইটিং মুডে দেহ যুদ্ধ ও পলায়নপর হতে চায়। এতে করে অতিমাত্রায় ক্যালরি প্রয়োজন হয়। এই ক্যালরির জন্ম দিতে গিয়ে অগ্ন্যাশয় এবং লিভারকে অহেতুক, অযথা ও অধিক পরিশ্রম করতে হয়। পরিণামে এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দুর্বল হয়, রক্তে গ্লুকোজের সৃষ্টি হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্লাড প্রেশারের ঔষধ খেতে হয়। খ) প্যারা-সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম: প্যারা-সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম মানে শান্ত স্নায়ুতন্ত্র যা রাগ, ভয়, ভীতি, লোভ-লালসা, স্ট্রেস ও টেনশনমুক্ত দেহে থাকে। ফলশ্রুতিতে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি/শক্তি খরচের ব্যাপার-স্যাপার থাকে না। ফলে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বিষণ্ণতা ইত্যাদি থাকে না। তাই প্রত্যেক মানুষের ছবর-শুকরিয়া, শান্ত মন, শান্ত দেহ এবং বিদ্বেষ, বিবাদ মুক্ত থাকাকেই ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেশারের উত্তম ঔষধ বলা হয়।
আরও পড়ুনজীবনাচরণ তথা লাইফস্টাইল মডিফিকেশন করে রোগ নিরাময় করা সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন গঠন করা হলে বড় বড় হাসপাতাল এবং ডাক্তারগণের কাঁচামাল নামক রোগী হ্রাস পাবে। ফলে ডাক্তার এবং হাসপাতালগুলোর উৎপাদন ও অর্থ হ্রাস পাবে। তেমনি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির লভ্যাংশও কমবে। তাই বিশ্বব্যাপী ও দেশব্যাপী সংস্থা এবং সমাজে ঔষধ ছাড়া শিক্ষা, দীক্ষা, আচরণ, ব্যবহার, খাদ্য প্রাধান্যে রোগ সারানোর উপায় জোরদার হচ্ছে না।
টিএমএসএস-এর অন্যতম উদ্দেশ্য রোগ নিরাময় অপেক্ষা রোগ সৃষ্টি বন্ধ করা (Prevention is bet ter than cure)। টিএমএসএস-এর বিভিন্ন শ্রেণির সব হাসপাতাল মিলিয়ে দেড় হাজার শয্যা বিশিষ্ট কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমরা হাপিয়ে যাচ্ছি; কারণ রোগ সৃষ্টি বন্ধকরণ কার্যক্রম যেমন আমাদের জোরদার নয়, তেমনি জাতিতে এবং বিশ্বের কোথাও তেমন নাই। টিএমএসএস-এর পক্ষ থেকে রোগ নিরাময় অপেক্ষা রোগ সৃষ্টি না হওয়ার কার্যক্রম হিসেবে পিএইচইএন্ডএসপি পৃথক ডোমেইন সৃষ্টি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সেবা এবং প্রাথমিক টোটকা চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার যে সক্রিয় সাপোর্ট ও দান-অনুদান আছে, তা আমার বোধগম্য নয়। রোগ সৃষ্টিতে বাধা থাকলে জাতিক, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার ঔষধ বিক্রি, বড়ি বিক্রি, ইনসুলিন বিক্রির কি গতি হবে! সেজন্য শুধুমাত্র কিউরেটিভ এরিয়ায় প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি কর্পোরেট হাসপাতাল রমরমাভাবে চলছে এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা হানিজনিত কারণে রোগীগণের আধিক্যে হাসপাতালগুলো দিশেহারা হচ্ছে।
টিএমএসএস-এর পলিসি অর্দিনেস তথা নীতি আদর্শকতার ফলে টিএমএসএস-এর কোনো কোম্পানি, ফ্যাক্টরি, হাসপাতাল, হোটেল কিছুরই লভ্যাংশ টিএমএসএস-এর কোনো ব্যক্তির পকেটে যেতে পারে না, জায়েজ নাই। তাই কার্যক্রমগুলোকে শক্তিশালী করা, নতুনত্ব আনা ও গুণমান বৃদ্ধি করার প্রবণতায় প্রবলতা নাই। এজন্য ইনসেনটিভ বেজড ও প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রতি কেন্দ্র থেকে জোরালো তাগিদ থাকলেও প্রণোদনা অপেক্ষা বেতন বৃদ্ধির প্রতি আগ্রহ বিদ্যমান।
কুলিন এবং স্বাভাবিক যেকোনো পরিবারের পারিবারিক বুকশেলফ্/লাইব্রেরি অনুসন্ধানে দেখা যায়, নাটকের বই, গানের বই, গল্পের বই, বিনোদন বিচিত্রা বই, নিদানপক্ষে অল্পমাত্রায় ধর্ম শিক্ষার বই দৃশ্যমান হলেও স্বাস্থ্যশিক্ষার বই পাওয়া যায় না। টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা: মো: জাকির হোসেন ও অন্যান্য শিক্ষকগণের লিখিত স্বাস্থ্য বিষয়ক বই টিএমএসএস-এর ৫০ হাজার বেতনভুক্ত জনবলের ৫০ জনের বাড়িতে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ; এমনকি টিএমএসএস-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৪৩টি লাইব্রেরিতেও দৃশ্যমান নাই। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জ্ঞানসম্পন্ন করে সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন, “লাইসালের ইনসানে ইল্লা মা সা আ” অর্থাৎ মানুষ যা করবে তার অতিরিক্ত পাবে না। কিন্তু আমরা মানুষ আমাদের সিমপ্যাথেটিক নার্ভকে ব্যস্ত রাখার জন্য করবো কম, চাইব বেশি- যাকে লোভ বলা হয়। এই লোভ লালসা পূরণ না হলে টেনশনের অন্ত নাই। শক্তির উৎসের ৪ ও ৫ নম্বর শ্রেণিতে খাদ্য হিসেবে ফাইবার, আঁশ, ছোবড়া, খনিজ ইত্যাদি রান্না করা থেকে বেশি বেশি কাঁচা খেলে উপকার অনেক বেশি। তাই বলেছি- কাঁচা মানে বাঁচা।
লেখক : (অশোকা ফেলো, পিএইচএফ অ্যান্ড একেএস)
চেয়ারম্যান,টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এবং নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1793254520.jpg)
_medium_1793252796.jpg)
_medium_1793164962.jpg)
_medium_1793088500.jpg)
_medium_1793079176.jpg)
_medium_1793007062.jpg)
_original_1792662207_medium_1793615547.jpg)
_medium_1793528072.jpg)
_medium_1793615492.jpg)