নজিবর রহমান জিয়া
দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড়ই প্রয়োজন
বাংলাদেশের বিগত সময়ের প্রায় সকল সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি কম বেশী ছিল। গত ফ্যাসিষ্ট সরকার তো দেশের ঘরে ঘরে চাকুরির ব্যবস্থা করবে মর্মে নির্বাচনকালীন জোরে সোরে প্রচার করে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে তা উল্লেখও করেন। বিগত কোন সরকারই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভাল অবদান রাখতে সক্ষম হননি। কর্মসংস্থান বলতে শুধু সরকারি চাকুরি না, শুধু সরকারি চাকুরি দিয়ে দেশের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। প্রতিবছর দেশে যে হারে উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নাই। দেশে অনেক সমস্যার মূল হচ্ছে বেকারত্ব। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে তেমনি মাদকদ্রব্যের প্রচলন, কিশোর গ্যাংয়ের আবির্ভাব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা বিরাজ করায় সরকারের প্রতি জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করছে। আসলে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি সরকার ইচ্ছা করলেই হ্রাস করতে পারবে না। অনেক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারেও মূল্য বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। একমাত্র আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে সরকার যদি ঐ বৃদ্ধিকৃত মূল্য ভর্তুকি দেয় তবে দেশের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা ভাল নয় যে, এই বিশাল অংকের অর্থ ভর্তুকি দিয়ে সরকার দেশ চালাতে পারবে। তাই প্রয়োজন দেশের বেকারত্বের হার কমিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মানুষের আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না।
গত ২২/১০/২৬ তারিখে বগুড়ার মমইন হোটেলে বাংলাদেশ প্রতিদিন কর্তৃক দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রয়োজন শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে অনেক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আরাফাত রহমান কোকো স্পোর্টস ভিলেজ, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরও অনেক কিছু। কিন্তু উত্তরবঙ্গের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কোন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ভারী শিল্পকারখানা তৈরি বা বেসরকারি খাতের ইকোনমিক জোনগুলোকে সরকারিভাবে সহায়তা করে গতিশীল করা। উত্তরবঙ্গে একমাত্র বেসরকারিভাবে টিএমএসএস, গাক, এসকেএস, আরডিএস প্রভৃতি এনজিওগুলো বেকারত্ব দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তন্মধ্যে টিএমএসএস অন্যতম কারণ টিএমএসএস- এ প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে কৃষি নির্ভর শিল্প কারখানা স্থাপনা করা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের মানুষ অধিক খুশি হতো যদি বগুড়াকে বিভাগ ঘোষণা করা হতো। এতে বিভাগীয় সকল অফিস বগুড়ায় স্থাপন হতো, জনগণের সেবা ত্বরান্বিত হতো এবং সরকারিভাবে অনেক মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। সরকারি হিসেবে দেশে বেকার জনগণের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ বেসরকারি হিসেবে হয়তো আরও অনেক বেশী হবে। প্রতিবছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ০৭ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করলেও মাত্র ০৩ লাখের মতো আনুষ্ঠানিক চাকুরি তৈরি হয়। এতে প্রতিবছরই দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়ছে প্রায় ০৪ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক।
দেশে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদনের সাথে কর্মসংস্থানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নতুন শিল্প কলকারখানা তৈরি না হলে যেমন উৎপাদন বাড়ে না তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না। বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে অর্থাৎ মাত্র ৪.৪৭%। এর অন্যতম কারণ দেশে গ্যাস সংকট, জ্বালানী অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের কারণেও বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বেকারত্বের হার আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির হারও কমে আসছে। একমাত্র নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মালয়েশিয়াতে জনশক্তি রপ্তানির দ্বার খুলেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে বেশ কিছু সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুনবিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর রয়েছে। এই সফরেও হয়তো দেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সুখবর আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে আন্তরিক, সততা, মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন। আমাদের মন্ত্রিসভার সদস্যরা কি সেই শ্রম, আন্তরিকতা ও মেধাবী হিসেবে পরিচয় রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। এই দেশে উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা আমলা। আমলারা একটি সরকারকে ডুবাতেও পারে আবার তুলতেও পারে।
দেশের রাজনীতি অনেকটা আমলা নির্ভর হয়ে গেছে। বিগত সরকারের সময় আমলারাই ভোট করে ফ্যাসিষ্টদের সরকার বানিয়েছে। এতে প্রমাণ হয় আমলারা এই দেশে সবকিছুই করতে পারে। উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে আমলা নির্ভরতা হ্রাস করা প্রয়োজন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে আমলা নির্ভরতা কমিয়ে গ্রামে গঞ্জে পায়ে হেঁটে স্বচক্ষে দেখে উন্নয়ন করেছেন। বর্তমান সরকার প্রধানও একইভাবে বিভিন্ন কর্মসূচীতে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে কাজ করছেন। যা দেশের জনগণের মধ্যে পুনরায় আশার সঞ্চার করেছে। যদি আমরা এতে সফল হতে না পারি তবে এ জাতিকে বড় মূল্য দিতে হবে এবং ৫ই আগষ্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই সকল পক্ষকে ধৈর্য্য ধারণ করে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা উচিত।
লেখক : গবেষক ও কলামিষ্ট
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1793007062.jpg)
_medium_1792994112.jpg)
_medium_1792909942.jpg)
_medium_1792823374.jpg)
_medium_1792818060.jpg)
_medium_1792663066.jpg)
_medium_1793079176.jpg)

