বগুড়ায় ওভারপাসের দেয়ালে ফুটছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের রং
শহর প্রতিনিধি: পোস্টার, ব্যানার আর অননুমোদিত দেয়ালিকায় ঢাকা পড়া ওভারপাসের দেয়ালে এখন ফুটে উঠছে বগুড়ার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি। চার লেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশের বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে বৃহৎ আকারের মুরাল পেইন্টিংয়ের কাজ। শহরের সৌন্দর্যবর্ধন ও নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চার লেন জাতীয় মহাসড়কের মহানগরাংশে একটি রেল ওভারপাস ও দুটি ওভারপাস রয়েছে। এর মধ্যে বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব দিকের দেয়ালে এক্রেলিক রঙে আঁকা হচ্ছে একের পর এক চিত্রকর্ম।
সেখানে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, জিয়ত কুণ্ডু, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বগুড়ার দই, আলু এবং ঐতিহ্যবাহী লাল মরিচসহ নানা বৈচিত্রময় বিষয়। বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে একসূত্রে গেঁথে শুরু হয়েছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ।
চিত্রকর্মের এই উদ্যোগটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক এবং ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সন। তিনি জানান, বগুড়া মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিত্রকর্মের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন’ (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের সংস্থানসহ মহাসড়কটিকে উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, শাজাহানপুরের ফটকি সেতু এবং সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো চালুর পর থেকেই নানা পোস্টার, দেয়ালিকা ও অননুমোদিত চুনকামে (চিকামারা) ভরে উঠতে থাকে, ফলে ম্লান হয়ে যায় নগরের নান্দনিকতা। ২০২৪ সালের আগস্টের উত্তাল সময়ে এসব দেয়ালে জুলাইয়ের দাবি ও শহীদদের প্রতিকৃতিসহ বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হলেও পরবর্তী সময়ে তা-ও অননুমোদিত দেয়ালিকা ও পোস্টারের নিচে ঢাকা পড়ে যায়।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক জানান, বগুড়া শহরের ফ্লাইওভারের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং শহরের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতেই দেয়ালগুলোতে বগুড়ার স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরে দৃষ্টিনন্দন ওয়াল আর্ট ও মুরাল তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, উদ্যোগটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা অবগত আছেন।প্রকৌশলী রাশেদুল হক আরও বলেন, “ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে, বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়, সেই লক্ষ্যেই সওজের এই সরকারি উদ্যোগ।”
প্রকৌশলী রাশেদুল হক দেয়ালে পোস্টার বা বিজ্ঞাপন না লাগানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ব্যয় ও সাফল্য বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস এবং শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও দৃষ্টিনন্দন এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।দ
মন্তব্য করুন







