প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৭ পিএম
হুতিদের হামলার পর ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম
সৌদি আরবে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের উভয় বেঞ্চমার্কের দাম ৩ ডলারের বেশি বেড়েছে।
এর মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫৫ ডলার বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬ দশমিক ৭২ ডলারে পৌঁছায়। গত ২৯ এপ্রিলের পর এটিই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দাম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৮০ ডলার বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান ক্রস-অ্যাসেট কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাই তেলের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চালানোর পর বাজারে এই উদ্বেগ বেড়েছে।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো উপসাগরের তীরে বাহরাইনের কাছে ধাহরানে অবস্থিত তাদের সদর দপ্তর খালি করার নির্দেশ দেয়। মূলত হুতিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুওয়াইন উপকূলে একটি ট্যাংকার থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণ এখনো জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারটিও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জাহাজ চলাচল-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় আল জাজিরা গ্রামের ১৩ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো বলেন, গত এক সপ্তাহে ট্যাংকারে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন এখন বাড়লেও পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
গত মাসে ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার পর তাদের সঙ্গে ইয়েমেনের বর্তমান সরকারকে (আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত) সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘর্ষ শুরু হয়।
২০১৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দিক থেকে অক্টোবর ছিল সবচেয়ে খারাপ মাস।
এদিকে চলমান সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে। লুইজিয়ানার লেক চার্লস এলাকায় ফিলিপস ৬৬-এর একটি শোধনাগারে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অবশ্য ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই এসপিআর থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ নেন। এর ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এসপিআর থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়েন।
জার্মানিতেও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে দেশটির জাতীয় তেল মজুত সংস্থা ইবিভি। অক্টোবরের শুরুতে জি-৭ দেশগুলো ট্রাম্পের চাপের মুখে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়তে সম্মত হওয়ার পর এটিই জার্মানির প্রথমবারের মতো মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ।
এদিকে লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের প্রধান বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানান, হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে যাওয়া একটি তেল পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুটি তেলক্ষেত্রেই উৎপাদন কমে গেছে।
অন্যদিকে, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে রপ্তানি চুক্তি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ডিজেল পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের বাড়তে থাকা দাম কমানোর উদ্যোগ হিসেবে ট্রাম্প চলতি মাসে রাশিয়া থেকে জ্বালানি রপ্তানির ঘোষণা দেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোও এর অন্যতম লক্ষ্য।
এদিকে ভবিষ্যৎ তেল ও গ্যাস উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রের রিগের সংখ্যা টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল জ্বালানি পরিষেবা প্রতিষ্ঠান বেকার হিউজের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে মোট তেল ও গ্যাস রিগের সংখ্যা ৬০৩ টিতে স্থির ছিল।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1792837966.jpg)
_medium_1792836303.jpg)
_medium_1792834081.jpg)
_medium_1792833204.jpg)
_medium_1792829857.jpg)
_medium_1792828652.jpg)