ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০১:০৭ পিএম

দৈনিক করতোয়ার অর্ধশতাব্দীর গৌরবোজ্জ্বল পথচলা

রাকিবুল ইসলাম : সময়ের প্রবহমান স্রোতে সুবর্ণজয়ন্তী বা পঞ্চাশ বছর অতিক্রম করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই এক বিশাল মাইলফলক। তবে সেই প্রতিষ্ঠানটি যদি হয় একটি সংবাদপত্র, তবে এই দীর্ঘ পথচলা কেবল টিকে থাকার সংগ্রাম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিবর্তনের জীবন্ত দলিল। ১৯৭৬ সালে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া থেকে যে ‘দৈনিক করতোয়া’ তার অদম্য যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একান্ন বছরে পদার্পণ করেছে। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের মফস্বল শহর থেকে প্রকাশিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলার এই আখ্যান কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অনুপ্রেরণা। এটি কেবল একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক অবিস্মরণীয় জয়যাত্রা।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাঠামোগত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীকেন্দ্রিক পত্রিকাগুলোর প্রবল দাপটে আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোর টিকে থাকা সবসময়ই এক অসম লড়াই। সীমিত বিজ্ঞাপনের বাজার, আধুনিক মুদ্রণ যন্ত্রের অভাব এবং নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে অধিকাংশ আঞ্চলিক পত্রিকাই অকালে হারিয়ে যায় কিংবা একটি নির্দিষ্ট গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু ‘করতোয়া’ সেই চিরাচরিত নিয়মের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এই সাফল্যের নেপথ্য রসায়ন লুকিয়ে আছে পত্রিকাটির নিজস্ব সংবাদ-দর্শন ও গণমানুষের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতায়। করতোয়া তার দীর্ঘ যাত্রায় কখনোই নিজের শেকড়কে ভুলে হয়নি। উত্তরের কৃষকের হাহাকার, সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক বঞ্চনা, নদীভাঙন কবলিত মানুষের আর্তনাদ এবং তৃণমূলের প্রতিটি সংকট তারা পরম মমতায় ও সাহসিকতার সাথে জাতীয় প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে। একসময় যে উত্তরবঙ্গকে কেবল অবহেলা হিসেবে দেখা হতো, সেই জনপদের মানুষের অধিকার আদায়ে করতোয়া ছিল এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি উন্নয়ন পদক্ষেপে  করতোয়া জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্র ও প্রান্তিকের মাঝে করতোয়া তৈরি করেছে এক মজবুত তথ্যসেতু। একইসাথে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরের ক্ষেত্রেও তারা বজায় রেখেছে পেশাদারিত্বের উচ্চমান। ফলে, আঞ্চলিক পরিচয় ছাপিয়ে করতোয়া আজ সারা দেশের মানুষের কাছে এক আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

একটি সফল গণমাধ্যমের প্রাণশক্তি হলো তার সম্পাদকীয় নীতি, সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং প্রবল উদ্যমী সাংবাদিক। গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ পার করেছে বহু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু এবং গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের নানা অধ্যায়। এমন বৈরী ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে একটি পত্রিকার মেরুদন্ড সোজা রাখা নিছক কোনো সাধারণ কাজ নয়।

করতোয়ার এই সুদীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল পথচলার নেপথ্যে যাঁর প্রজ্ঞা ও মেধা ধ্রুবতারার মতো দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তিনি হলেন এর সম্পাদক মোজাম্মেল হক। অর্ধশতাব্দী ধরে একটি পত্রিকাকে পরম মমতায় আগলে রাখা এবং পরিবর্তিত সময়ের প্রতিটি বাঁকে তাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে করতোয়া কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোতে গা না ভাসিয়ে, সাংবাদিকতার চিরাচরিত মূল্যবোধ বজায় রেখে কীভাবে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, মোজাম্মেল হক তার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই ইস্পাতকঠিন নেতৃত্ব ও আপসহীন নীতিই পত্রিকাটিকে বারবার প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে।

আরও পড়ুন

তাঁর সময়োপযোগী ও আধুনিক উদ্যোগে ছাপা কাগজের ঐতিহ্যকে ধারণ করেই পত্রিকাটি আজ অনলাইন সংবাদমাধ্যমেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে করতোয়ার সংবাদ এখন মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে। প্রিন্ট সংস্করণের দীর্ঘ ঐতিহ্য আর ডিজিটালের গতিময়তাকে একসূত্রে গেঁথে  করতোয়া নতুন অধ্যায় রচনা করছে। কাগজের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রবল প্রসারে মুদ্রিত সংবাদপত্রের অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন ‘করতোয়া’ এই ডিজিটাল বিপ্লবকে সংকট হিসেবে না দেখে সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, খবর পড়ার মাধ্যম বদলালেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি। এই আধুনিকায়নের সফল ফসল হলো ‘করতোয়া অনলাইন’। দ্রুততম সময়ে নির্ভুল তথ্য সরবরাহ, আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এবং গভীর বিশ্লেষণাত্মক খবরের মাধ্যমে এটি আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল গণমাধ্যম হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে।  ৫০ বছরের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ‘দৈনিক করতোয়া’ প্রমাণ করেছে যে, সততা এবং জনমানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে মফস্বল থেকেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা যায়।

আজ করতোয়া কেবল একটি সংবাদপত্র নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের আবেগ, অস্তিত্ব ও অহংকারের নাম। অর্ধশতাব্দী ধরে যে পত্রিকাটি সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও পরিণত ও শানিত হবে, এটাই পাঠকের প্রত্যাশা। অতীত ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আগামীর আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করার এই যে নিরন্তর প্রচেষ্টা, তা দীর্ঘজীবী হোক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সত্যের সন্ধান এবং গণমানুষের সেবায় করতোয়ার এই দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত থাকুক শতাব্দীর পর শতাব্দী। নতুন প্রজন্মের কাছে করতোয়া হয়ে উঠুক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম। নব দিগন্তের পথে করতোয়ার এই অভিযাত্রা হোক অম্লান, অবিচল ও অনন্ত।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ০১৭৭৫-৯৯১২৭৬ rakibdolon1971@gmail.com

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দৈনিক করতোয়ার অর্ধশতাব্দীর গৌরবোজ্জ্বল পথচলা

শাড়ি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ, জামিন পেলেন তানজিন তিশা

পুতিনের প্রাসাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি ইউক্রেনের

রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদের পক্ষে ১১ দলীয় জোটের মনোনয়নপত্র জমা

পিতৃশোক কাটিয়ে মাঠে ফিরেও ক্লাবকে জেতাতে পারলেন না মেসি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি : ইরান