ভিডিও বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৩ এএম

দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দেশ কবে হবে মুক্ত 

মোছা. মিশকাতুল ইসলাম মুমু : বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে প্রতিনিয়ত বিদ্যমান। প্রায় সকল আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং এ বাংলাদেশ বারবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে স্থান পায়। যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করছে। এ অবস্থায় দেশের প্রত্যেক নাগরিকের আকাক্সক্ষা থাকে একটি সুষ্ঠু, গণতান্ত্রিক সমাজের অংশীদার হওয়ার, যেখানে ন্যায়, সততা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, ভিন্ন মতাদর্শ বা মতপার্থক্য থাকলেও তা গ্রহণ করার সক্ষমতা অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় না, ফলে দুর্নীতির শেকড় আরো গভীরে প্রোথিত হয়। 

বাংলাদেশে দুর্নীতির কারণগুলো বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে,দুর্নীতির পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণ, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রথমত রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার বৃদ্ধি পায়, যা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে পার্টি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতে কেন্দ্রীভূত করে এবং জবাবদিহিতার অভাব সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয় না, ফলে দুর্নীতি বৃদ্ধি পায় এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকে। দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতা দুর্নীতির প্রসারকে উৎসাহিত করে, কারণ দুর্নীতির জন্য শাস্তির ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেকে দুষ্কৃতিকারী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। তৃতীয়ত, সমাজে প্রচলিত স্বজনপ্রীতি, ঘুষ গ্রহণ ও সুবিধা নেওয়ার অসৎ সংস্কৃতি দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করার মাধ্যমে তা আরও বিস্তার লাভ করে। চতুর্থত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উচ্চ বেকারত্বের কারণে অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নেয়, যেখানে সরকারি চাকরি বা ব্যবসায় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। সর্বশেষে, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও বিচার বিভাগের ধীরগতি দুর্নীতিবাজদের অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়, যা তাদের আরো উৎসাহিত করে। তাই এসব আন্তঃসংযুক্ত কারণের সমাধান ছাড়া বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নাজুক। এই পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া কমিশনের পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কারণ যদি কমিশন নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয় তবে তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। আশার কথা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যেই দুদকের সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে এবং একটি পৃথক কমিশন গঠন করেছে। যার কাজ হবে দুদকের ক্ষমতা, দক্ষতা, কর্মপ্রক্রিয়া ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন ও উন্নয়ন। 

এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে দুদকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ থেকে এটি মুক্ত থাকতে পারে। অতীতে কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, ফলে এখন দুদকের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। সেইসঙ্গে কমিশনের কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি, যাতে দুর্নীতির তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ ও বিচার কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়। পাশাপাশি, আইনি কাঠামোকে আরও মজবুত করে, তদন্ত ও বিচারে সময়মতো তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে যারা বিপুল সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

আরও পড়ুন

এসব উদ্যোগের পাশাপাশি গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। দুদককে জনগণের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। সব মিলিয়ে, সরকারের সদিচ্ছা এবং সংস্কারের এই উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আশা করা যায় যে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে দুর্নীতি আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনগণের সহযোগিতা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ একত্রে কাজ করলে বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। 

সর্বোপরি, দুর্নীতি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এটি শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, মানবিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দেয়। দুর্নীতির ভয়াবহতা কখনো একটি কারখানার ধ্বংসে, কখনো বা একটি যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কতটা গভীরে এর শিকড় বিস্তৃত। তাই এখনই সময় দুর্নীতিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শক্তিশালী ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, আইনের কঠোর প্রয়োগ, এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। যদি এই সকল উপাদান একত্রে কাজ করে, তবে দুর্নীতির শিকড় ধীরে ধীরে উপড়ে ফেলা সম্ভব এবং বাংলাদেশকে একটি সুশাসিত, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গঠন করা সম্ভব হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দেশ কবে হবে মুক্ত 

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের বৈঠক শুরু

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের দাপট, পেস তোপে চাপে স্বাগতিকরা

বড় আন্দোলনের পথে ১১ দলীয় ঐক্য

ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

নিলামে বিক্রি হলো র‌্যাবের প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াডের ৮ কুকুর