বিরোধীর মুখে প্রশংসা, তারেক রহমানের রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির সূচনা
কালাম আজাদ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের মুখ থেকে প্রশংসা পাওয়া 'বিশাল ব্যাপার'। বিশেষ করে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের সময়ে। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের ভালো কাজকে বিরোধী দল স্বীকার করবে, এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব কম দেখা যায়। বরং প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষ যা-ই করুক, তার মধ্যে ত্রুটি খুঁজে বের করে বিরোধীরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টো ঘটনা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও গুরুতর আহত ১০ ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন। এই ঘটনাকে সাধুবাদ জানিয়ে বিরোধী দলীয় অর্থাৎ এনসিপির নেতা সার্জিস আলম লিখেছে, 'আপনাকে ধন্যবাদ জানাই'।
বিরোধী শিবিরের একজন নেতার মুখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগের প্রশংসার মধ্যে আরও অনেক কথা লুকিয়ে থাকতে পারে। সার্জিস বলেছেন, যেসব গুরুতর আহত মানুষ পরিবারের একমাত্র অবলম্বন হয়েও এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না, যাদের কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, কেউ অঙ্গ হারিয়েছেন, কেউ চলাচলের সক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই যে, একজন বিরোধী রাজনীতিক সরকারের একটি ভালো উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে স্বীকার করেছেন। এটি যেকোনো দেশের রাজনীতিতে খুব স্বাভাবিক ঘটনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এটির ব্যতিক্রম হয়। কিন্তু স্বাভাবিক ঘটনায় এখানে আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি সরকারে থাকলে বিরোধী দলের সবকিছু ভুল, বিরোধী দলে থাকলে সরকারের সবকিছু ভুল; এই প্রবণতার কারণে সাধারণ মানুষ মাশুল দেয়। এটি কখনোই গণতান্ত্রিক চর্চা হবার কথা নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের কাজ সরকারকে প্রশ্ন করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া, জবাবদিহির মধ্যে রাখা। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সরকারের প্রতিটি কাজেরই বিরোধিতা করতে হবে।
সরকার ভালো করলে প্রশংসা করতে হবে, ভুল করলে সমালোচনা করতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলের ভালো প্রস্তাব থাকলে সরকারকেও তা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে। রাজনীতির এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশে। কারণ সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হবে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে; কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যাবে। রাষ্ট্রের স্বার্থ কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এবারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস স্বাক্ষী দিচ্ছে তারেক রহমান পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতে চাচ্ছেন। এই বক্তব্যের অর্থকে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের বিষয়টি বিবেচনায়বিরোধীর মুখে প্রশংসা, তারেক রহমানের নিলে সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির অর্থ আরও বিস্তৃত। আরও ব্যাপক। এখানে অনেকগুলো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। এটি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে না। প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ অন্যায্য সুবিধা বা বঞ্চনার শিকার হবে না। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন রাজনীতি মানে জন্মাণের অর্থের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা।
সরকারের প্রতিটি টাকা জনগণের টাকা। উন্নয়ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পের নামে অর্থ অপচয়, এসব বন্ধ করা যেমন জরুরি, তেমনি সরকারি সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় রগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। একজন কৃষক যেন কৃষি অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন, একজন ব্যবসায়ী যেন লাইসেন্স পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য না হন, একজন রোগী যেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে দালালের দ্বারস্থ না হন; এসবও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির অংশ। এটিই আমরা চাই।
বাংলাদেশে উন্নয়ন বলতে দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে বোঝানো হয়েছে। সেতু হয়েছে, মহাসড়ক হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, শহরের চেহারা বদলেছে। কিন্তু আগামী দিনের উন্নয়নের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত হতে হবে। এই সংজ্ঞায় আলোচনায় আসতে পারে, মানুষের আয় বাড়ছে কি না, কর্মসংস্থান হচ্ছে কি না, তরুণরা দেশে ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে কি না, কষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন কি না, ছোট ব্যবসায়ী টিকে থাকতে পারছেন কি না, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার চাপ কমছে কি না, এসব বিষয়। দারুণ খবর হলো এসব বিষয় মাথায় নিয়ে সরকার কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করেছে। রাষ্ট্র মানুষের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের অঙ্গিকার নিয়ে কাজ করছে। এটি তারেক রহমানের দূরদর্শিতার অংশও বটে।
গত কয়েক মাসে তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার দর্শন দেখে কিছু কথা বলতে চাই। মানুষের সাধারণত স্বাভাবিক জীবনের গতিপথের কথা ভেবেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছেন, জীবনমান সহজ করতে মানুষের হাতে টাকা থাকতে হবে। বাজারে স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খল হবে। অর্থাৎ উন্নয়নকে মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। তার প্রতিফলনও সমাজে দেখা যাচ্ছে। সরকার 'তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন' প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। জেলা পর্যায়েও যুগোপোযোগী শিক্ষার উপর জোর দিয়েছেন।
তারেক রহমানের রাজনীতিতে তরুণদের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বহু বছর ধরে তরুণদের প্রধানত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ব্যবহার করেছে। মিছিল করবে, পোস্টার লাগাবে, প্রচারণা চালাবে, এই পর্যন্তই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থেকেছে অনেক ক্ষেত্রে। নতুন রাজনীতি যদি সত্যিই নতুন হতে চায়, তাহলে এই ধারণা বদলাতে হবে। তরুণরাও রাষ্ট্রের অংশীদার হবে। তাদের নীতিনির্ধারণে জায়গা দিতে হবে। প্রশাসন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে।
আরও পড়ুনচাকরির বাজারে স্বচ্ছতা, সরকারি নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা; এসবই তরুণদের সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনার বাস্তব রূপ দেওয়ার কাজও সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় এনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে।
আগামী দিনের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আয়, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে। মানুষ রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারে গিয়ে চাল-ডাল-তেল কিনতে হয়। একজন পরিবারের প্রধান মাসের আয় দিয়ে মাসের খরচ মেলাতে না পারলে তার কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বাজারের দাম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জরুরি। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সবচেয়ে কাছ থেকে বোঝেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন। রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপমাএসব মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ক্ষমতাবান, স্বচ্ছে ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
জনপ্রতিনিধিদের নিয়ম করে এলাকার জনগণের কাছে আসতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। একই সাথে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো তদারকির ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সম্ভাবনা আছে। উন্নয়নকে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে হবে। একটি শহর যদি তার নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে ঢাকামুখী মানুষের চাপও কমবে।
পরিচ্ছন্ন রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে প্রশাসনিক সংস্কার। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় পরিচয়ের বাহিরে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র যদি নাগরিককে ভয় দেখায়, তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ থাকে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু স্মরণসভা, পোস্টার, ব্যানার বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত শিক্ষা হারিয়ে যাবে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে, রাষ্ট্রের মালিক জনাণ। এমপি মন্ত্রীদের এসব বিষয়ে ভাবতে হবে।
ফিরে আসি সার্জিসের বক্তব্যে। একজন বিরোধী নেতা সরকারের একটি উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর ঘটনা রাজনীতির নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি, যেখানে ভালো কাজের প্রশংসা করতে দলীয় পরিচয় বাধা হবে না? আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ পাব, যেখানে সরকার বিরোধী দলের ভালো প্রস্তাব গ্রহণ করবে এবং বিরোধী দল সরকারের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেবে? কারণ গঠনমূলক সমালোচনা বিশ্লেষণ করেই গণতন্ত্র তার সঠিক পথে চলতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বৈরতন্ত্র নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।
লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট উত্তরাঞ্চল প্রধান, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
সমন্বয়কারী, বিএনপি মিডিয়া সেল ও বিশেষ প্রতিবেদক দৈনিক দিনকাল
সাধারণ সম্পাদক, বগুড়া প্রেসক্লাব।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক
_medium_1786424935.jpg)






_medium_1786451068.jpg)
_medium_1786462496.jpg)