ভিডিও বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ : ০২ জুলাই, ২০২৬ ০৭:০১ পিএম

মাদক: যে বিষ নীরবে গ্রাস করছে প্রজন্ম

একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি আছে। ধরা যাক তার নাম শুভ। একসময় সে ছিল পরিবারের স্বপ্ন, বাবা-মায়ের ভরসা এবং সমাজের একজন সম্ভাবনাময় তরুণ। কিন্তু ভুল সঙ্গ, কৌতূহল, মানসিক অস্থিরতা কিংবা সহজলভ্যতার কারণে সে একদিন মাদকের জগতে প্রবেশ করে। শুরুটা ছিল সাময়িক, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মাদক সংগ্রহের জন্য শুভ প্রথমে পরিবারের কাছে মিথ্যা বলে, পরে ধার-দেনা করে, এমনকি একপর্যায়ে পরিবারের সম্পদ বিক্রি করতেও দ্বিধা করে না। তার আচরণ পরিবর্তিত হয়, সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ে এবং জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা হারিয়ে যায়। কিন্তু এই গল্প শুধু শুভর নয়। আমাদের চারপাশে হাজার হাজার শুভ রয়েছে, যাদের ব্যক্তিগত পতন আজ একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। মাদকাসক্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষতি যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও বেশি ভয়াবহ এর অদৃশ্য প্রভাব, যা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে গ্রাস করে। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার যুবসমাজ। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক এবং নীতিনির্ধারক। কিন্তু যখন এই যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের কবলে পড়ে, তখন রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মূল্যবান মানবসম্পদ হারাতে শুরু করে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন মাদকে আসক্ত হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো দেশ একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে হারায়।

মাদকাসক্তির ফলে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে, পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় এবং একপর্যায়ে শিক্ষা জীবন থেকে ছিটকে যায়। ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরির যে প্রক্রিয়া, তা বাধাগ্রস্ত হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মাদকাসক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি যখন মাদকে আসক্ত হয়, তখন তার উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি বাড়ে, কাজের মান কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রকে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের জন্যও বিপুল অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। মাদকাসক্তি এবং অপরাধের মধ্যেও একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মাদক সংগ্রহের জন্য অনেক ব্যক্তি চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা, চাঁদাবাজি এবং সহিংস কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমাজে অপরাধের হার বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ কমে যায়। একটি এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটলে সেখানে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। 

পারিবারিক বন্ধনের ওপরও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একজন মাদকাসক্ত সদস্যের কারণে পুরো পরিবার মানসিক চাপে ভোগে। বাবা-মা উদ্বেগে দিন কাটান, ভাইবোনেরা সামাজিকভাবে বিব্রত বোধ করে এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সহিংসতা, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো ঘটনাও দেখা যায়। ফলে মাদকাসক্তি শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবারের মানসিক কাঠামোকেও ভেঙে দেয়। বর্তমান বিশ্বে মাদক ব্যবসা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িত। অবৈধ মাদক পাচার থেকে অর্জিত অর্থ প্রায়ই অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হয়। ফলে মাদক শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ, অবৈধ বাণিজ্য এবং অপরাধচক্রের বিস্তার একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে? এর উত্তর একক নয়। বেকারত্ব, হতাশা, মানসিক অবসাদ, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয়, ভুল বন্ধুবৃত্ত এবং সচেতনতার অভাব-সবকিছু মিলেই একজন মানুষকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই সংকট মোকাবিলায় পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখা এবং প্রয়োজনে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সৃজনশীল কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। 

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। মাদক পাচার ও ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আসক্তদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন মাদকাসক্ত মানুষ কেবল শাস্তির নয়, পুনরুদ্ধারেরও অধিকার রাখে। তাকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারলেই প্রকৃত অর্থে মাদকবিরোধী লড়াই সফল হবে।

 মাদকাসক্তি কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই একদিনে এর সমাধানও সম্ভব নয়। কিন্তু সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। সেই প্রজন্ম যদি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই একসময় প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই আজ সময় এসেছে শুধু মাদককে নয়, মাদকের পেছনের কারণগুলোকে মোকাবিলা করার। সময় এসেছে দোষারোপের পরিবর্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কারণ একজন তরুণকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবনকে বাঁচানো নয়; একটি পরিবারকে বাঁচানো, একটি সমাজকে বাঁচানো এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।  

আরও পড়ুন

লেখক:

নানজিবা হক কহন

শিক্ষার্থী, বিভাগ বাংলা,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাদক: যে বিষ নীরবে গ্রাস করছে প্রজন্ম

সকালে খালি পেটে এক টুকরো কাঁচা হলুদ খাওয়ার উপকারিতা

সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার হুমকি ইসরায়েলের, জাতিসংঘে চিঠি ইরানের

গোপালগঞ্জে বাসের ধাক্কায় যুবক নিহত

‘কিশোর গ্যাং’কে ফেরাতে হবে পারিবারিক আবহে

সুউচ্চ ভবনের চূড়ায় উঠে দুঃসাহসিক বিয়ের প্রস্তাব, গ্রেপ্তার যুগল