ভিডিও মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশ : ০৯ জুন, ২০২৬ ০৪:৩৮ পিএম

‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ ও আগামীর প্রত্যাশা

উত্তরবঙ্গের হৃৎপিন্ড এবং এই অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত বগুড়া দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হয়ে এক প্রকার স্থবিরতার বৃত্তে বন্দি ছিল। তবে মহাকালের নিয়মে যেকোনো প্রাচীন জনপদই একসময় তার সুপ্ত সম্ভাবনা নিয়ে জেগে ওঠে; বগুড়াও আজ অবহেলা ও প্রান্তিকতার দীর্ঘ রজনী পার হয়ে এক নতুন ভোরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন গঠনের ঘোষণা শহরটির অবয়ব ও আত্মাকে বদলে দেওয়ার প্রাথমিক সুরটি বেঁধে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় 'বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' গঠনের যে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বগুড়াবাসীর নাগরিক মুক্তির এক নতুন ইশতেহার। তবে একটি নতুন নগর কর্তৃপক্ষের জন্ম হওয়াই চূড়ান্ত সাফল্য নয়, বরং তার দার্শনিক ভিত্তি এবং কর্মপদ্ধতি কেমন হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। আমরা যদি এ দেশের নগর উন্নয়নের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব আমাদের প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে উন্নত বিশ্বের আধুনিক নগর ভাবনার এক দুস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে।

নগর পরিকল্পনা মূলত একটি জীবন্ত দর্শন, যা কেবল ইট-পাথরের দেয়াল তোলে না, বরং মানুষের জীবনযাত্রার মানচিত্র এঁকে দেয়। ১৯৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন' গঠনের মধ্য দিয়ে যে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত নগর পরিকল্পনার বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ বিশ্বজুড়ে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির অভূতপূর্ব আধুনিকায়নের নেপথ্যে কাজ করেছে 'ঘণঈঊউঈ', আর বিশ্বের অন্যতম বসবাসযোগ্য শহর কোপেনহেগেনের নান্দনিকতার কারিগর ছিল 'সিপিএইচ সিটি অ্যান্ড পোর্ট ডেভেলপমেন্ট'-এর মতো দূরদর্শী সংস্থাসমূহ। অপরদিকে, আমাদের দেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন এবং কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) যা আজ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তথা রাজউক  নামে পরিচিত । আর এর পথ ধরে দেশে বর্তমানে ১১টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গড়ে উঠলেও তারা উন্নত বিশ্বের সেই কাক্সিক্ষত মানদন্ড ছুঁতে পারেনি। আমাদের দেশে প্রধান সংকটটি হলো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বৈপরীত্য; উন্নত বিশ্বে আগে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও উপযোগিতা বা ব্যবহারিক গুরুত্বের নিশ্চয়তা দিয়ে তারপর জনবসতি গড়ে তোলা হয়, আর আমাদের এখানে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন ঘটে যাওয়ার পর রাস্তা বা ড্রেন নির্মাণের জোড়াতালির প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। একই সাথে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা ভুলে বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্পে অতি-মনোযোগী হওয়া এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে একই রাস্তা বারবার খোঁড়াখুঁড়ির যে চিরচেনা নাগরিক ভোগান্তি, তা আমাদের নগর সংস্কৃতির এক নির্মম সত্য। নবগঠিত বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে শুরুতেই এই চর্বিতচর্বণ ও পুরনো ভুলের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে একটি কার্যকর ও আধুনিক সময়ের উপযোগী সংস্থায় রূপ দিতে হলে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার পূর্বেই কিছু সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। একটি মজবুত ইমারত যেমন দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি এই সংস্থার সাফল্যের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও শক্তিশালী অধ্যাদেশ। জাতীয় সংসদে 'বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন' পাসের মাধ্যমে এটিকে একটি শক্তিশালী বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে এর ভৌগোলিক আয়তন, ভূমি ব্যবহারের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকবে। এর পাশাপাশি, নবগঠিত বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব মাস্টারপ্ল্যানের সাথে প্রস্তাবিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনার যেন কোনো আইনি বা কাঠামোগত বিরোধ তৈরি না হয়, তা শুরুতেই দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এই স্বপ্নের ত্বরান্বিত বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যৌক্তিকতা তুলে ধরে তা দ্রুত চূড়ান্ত রূপ পাওয়া দরকার। সর্বোপরি, নগরবিশারদদের সমন্বয়ে এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং পরিবেশবান্ধব মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া তৈরি করতে হবে, যেখানে আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক জোন, শিল্পাঞ্চল, সবুজ পার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি সুষম ও বৈজ্ঞানিক বিন্যাস থাকবে। 

আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মূল দর্শন কেবল কিছু ভৌত অবকাঠামো বা বহুতল ভবন নির্মাণের সংকীর্ণ গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং তাদের মূল অভীষ্ট হতে হবে একটি মানবিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর 'স্মার্ট সিটি' বিনির্মাণ। অপরিকল্পিত নগরায়নের অভিশাপ থেকে এই প্রাচীন শহরকে রক্ষা করতে হলে কঠোর ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নে কোনো ধরনের আপস করা চলবে না; ভবনের উচ্চতা, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং পরিবেশগত মানদন্ড বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেকোনো বড় প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে নাগরিক অংশগ্রহণ ও বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে। আধুনিক শহর পরিচালনার জন্য জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (এওঝ), রিয়েল-টাইম ট্রাফিক মনিটরিং এবং গ্রিন টেকনোলজির মতো স্মার্ট প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে হবে এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মতো চিরকালীন ভোগান্তি এড়াতে সকল সেবা প্রদানকারী সংস্থাকে নিয়ে একটি 'সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সেল' গঠন করা সময়ের দাবি। এছাড়া, এই সংস্থাটিকে কেবল অভিজাত শ্রেণির জন্য প্লট বাণিজ্যের চারণভূমি না বানিয়ে, মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শহরের পুরনো বা পরিত্যক্ত এলাকাগুলোকে আধুনিক ও বাসযোগ্য এলাকায় পুনর্গঠন করতে হবে। একই সাথে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের  মাধ্যমে নতুন ব্যবসা, আইটি পার্ক এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের প্রধান অর্থনৈতিক হাবে রূপান্তর করার দূরদর্শিতা দেখাতে হবে।

বগুড়া আজ আর কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা শহর নয়, এটি এখন ডানা মেলতে যাওয়া এক উদীয়মান মহানগরী। অতীত অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাসকে পেছনে ফেলে বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি সঠিক, আধুনিক ও জনবান্ধব নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে তার পথচলা শুরু করতে পারে। বরং তা হয়ে উঠবে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি বাসযোগ্য, সুপরিকল্পিত এবং নান্দনিক স্মার্ট সিটির এক অনন্য রোল মডেল। এখন শুধু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং সঠিক পরিকল্পনার একনিষ্ঠ বাস্তবায়ন।

আরও পড়ুন

লেখক:

প্রকৌশলী লিটন চন্দ্র দাস

সদস্য, ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (ওঊই)
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, 
পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ৪

কর্ণফুলী গ্রুপে ম্যানেজার পদে চাকরি, কর্মস্থল চট্টগ্রাম

জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ঢাবির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর

মানুষের নিচু মানসিকতায় পরিবর্তন আসা উচিত: কঙ্গনা

মাস্টারপ্ল্যান মোতাবেক বগুড়াকে উন্নয়ন করা হবে 

উত্তরা মটরসে নিয়োগ, বেতন ৪০ হাজার টাকা