ভিডিও বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩০ দুপুর

নকল করার প্রবণতা ঘিরে আমাদের শিক্ষা

প্রাক কথন: সারাদেশে গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষা। সারাদেশে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন এই পরীক্ষায়।  

ক. নকল বন্ধ করা একটা প্রয়োজনীয় কাজ, কিন্তু এটি এটি শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য নয়, এটি একটি উপলক্ষ মাত্র। শিক্ষামন্ত্রীর উচিত পরীক্ষার হলের কড়াকড়ি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় মনোযোগ দেওয়া। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় পরীক্ষার ‘খাতায় নয়, বরং শ্রেণিকক্ষে গড়ে ওঠা চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ এবং দক্ষতার মাধ্যমে। আসলে লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে, যেখানে জ্ঞান অর্জনই হবে মুল প্রেরণা এবং যেখানে নকল করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে না।


খ. আসলে নকল কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি লক্ষণ। একটি অসুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার বহি:প্রকাশ। যেখানে শিক্ষার্থীরা শেখার আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পরীক্ষাই চূড়ান্ত গন্তব্য; সেখানে নকল অবধারিতভাবেই জায়গা করে নেবে। শিক্ষার্থীরা যখন বুঝতে পারে যে তাদের সাফল্য নির্ধারিত হবে কয়েক ঘণ্টার একটি পরীক্ষায়, এবং সেই পরীক্ষার প্রশ্নও প্রায়শই পূর্বানুমানযোগ্য, তখন তারা জ্ঞানের গভীরে না গিয়ে শর্টকাট খুঁজবে; এটাই স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা। ফলে নকলের বিরুদ্ধে কঠোরতা দেখিয়ে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং এটি সমস্যার পৃষ্ঠদেশে আঘাত করা মাত্র। শিক্ষামন্ত্রীর ঝটিকা অভিযান, পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ, এমনকি বাথরুম তল্লাশির মতো নির্দেশনা এসব পদক্ষেপ দৃশ্যত কঠোর এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু এগুলো শিক্ষার গুণগত সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। বরং এগুলো একটি বার্তা বহন করে যে আমরা সহজে দৃশ্যমান সমস্যাকে মোকাবিলা করতে বেশি আগ্রহী, কিন্তু গভীর ও জটিল সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যেতে চাই। একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে না কতটা কড়াকড়িভাবে নকল বন্ধ করা হলো তার উপর; বরং নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কতটা আগ্রহ নিয়ে শিখছে, কতটা দক্ষতা অর্জন করছে, এবং তারা বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করতে পারছে তার ওপর।


গ. বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, নানা জটিলতা এবং কখনো কখনো শিক্ষক নিয়োগে অনৈতিক সুবিধা নেয়া অস্বচ্ছতা শিক্ষার মানকে দুর্বল করে তুলছে। একজন শিক্ষক যদি নিজেই বিষয়বস্তুর গভীরে না যেতে পারেন, যদি তার মধ্যে সৃজনশীলতা বা আধুনিক শিক্ষাদর্শের অভাব থাকে, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই গুণাবলি গড়ে তুলবেন? অথচ আমরা সেই শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় নকল ঠেকাতে ব্যস্ত, কিন্তু কেন সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের একটি বড় অংশই কাঙ্ক্ষিত মান পূরণ করতে পারছে না- সে প্রশ্নটি তুলতে অনীহা দেখা যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে সেকেলে ও মুখস্থনির্ভর কারিকুলাম। বর্তমান বিশ্বে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, সেখানে আমাদের পাঠ্যক্রম এখনো অনেকাংশে তথ্য মুখস্থ করার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়ে, শেখার জন্য নয়। তারা জানে কোন প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে উত্তর লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে; কিন্তু তারা জানে না কেন সেই জ্ঞান প্রয়োজন, বা কীভাবে তা বাস্তব জীবনে ব্যবহার করা যায়। এই বিচ্ছিন্নতাই তাদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং নকলের মতো শর্টকাটের দিকে ঠেলে দেয়। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষার উপর একজন শিক্ষার্থীর বছরের পর বছর শেখার মূল্যায়ন নির্ভর করে। এটি একটি মৌলিক ত্রুটি। সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগত কাজের সক্ষমতা; এসর কিছুই এই পরীক্ষায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং  ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য যেকোন উপায় তারা খোঁজে। নকল তখন আর নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না ; এটি হয়ে উঠে কৌশলগত সিদ্ধান্ত। 

আরও পড়ুন


সমাপ্তি কথন: নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেবল কোচিং বাণিজ্য নয়। এটি মূল্যবোধ গঠনেরও একটি মাধ্যম। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা এবং তার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত। যখন শিক্ষকরাই কখনো কখনো অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ফলাফলের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তখন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সততা আশা করা বাস্তবসম্মত থাকে না। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর নকলবিরোধী অবস্থানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এটিকে একমাত্র অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা একটি বড় নীতিগত ভুল। এতে করে শিক্ষার গভীরতর সংকটগুলো আড়াল হয়ে যাচ্ছে। একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন রূপান্তরমূলক চিন্তা। শিক্ষক উন্নয়ন, কারিকুলাম সংস্কার, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন এবং শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ স্থাপন- এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে কেবল কঠোরতা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

 

মাহমুদ হোসেন পিন্টু

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নকল করার প্রবণতা ঘিরে আমাদের শিক্ষা

বকাঝকা করায় শাশুড়িকে গলা কেটে হত্যার পর বস্তায় ভরে মরদেহ লুকিয়ে রাখেন পুত্রবধূ

একাধিক শহরে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করল ইরান

বাবা-ছেলেকে দেখা যেতে পারে একই দলে!

২০ বছর ধরে তরুণের পেটে থার্মোমিটার

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের গ্রুপে ভারত