তারেক রহমানের উদ্যোগে আধুনিকায়নের পথে বগুড়া
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, আদর্শের উত্তরাধিকার এবং উন্নয়নের দর্শন এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে সামনে আসে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা যেমন ঐতিহ্যের অংশ, তেমনি তা নিজস্ব চিন্তা, কৌশল ও তৃণমূলমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে স্বতন্ত্রতাও লাভ করেছে। বিশেষ করে বগুড়া যা তাঁর পৈতৃক ভিটা ও রাজনৈতিক শেকড় এই অঞ্চলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও উন্নয়ন ভাবনা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কর্মকান্ডে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘটে ১৯৮৮ সালে, বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে। এরপর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালান। সেই সময় থেকেই তিনি রাজনীতির মাঠপর্যায়ে নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপির বিজয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। পরবর্তী সময় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলের সময়েও তিনি সক্রিয় থেকে সংগঠনকে সুসংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন, যা ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরও তারেক রহমান সরাসরি সরকারে যুক্ত না হয়ে একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি রাজনৈতিক দলের স্থায়িত্ব ও সাফল্যের মূলভিত্তি তৃণমূল পর্যায়ে নিহিত। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বাস্তব চিত্র অনুধাবন করেন। “একটি উদ্যোগ, একটু চেষ্টা এনে দেবে সচ্ছলতা আনবে দেশে স্বনির্ভরতা” এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি যে তৃণমূলভিত্তিক উন্নয়ন চিন্তা তুলে ধরেন, তা ছিল সময়োপযোগী এবং বাস্তবধর্মী। ২০০৪ সালে তাঁর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত তৃণমূল সম্মেলনগুলো শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং তা ছিল জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অনন্য প্রয়াস।
বগুড়ার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে বগুড়াকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিক শহরে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা বিচ্ছিন্ন কিছু প্রকল্পের সমষ্টি ছিল না; বরং একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রশস্তকরণ, নতুন রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ ও কালভার্ট স্থাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে, যা বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। বনানী থেকে মাটিডালী এবং সাতমাথা থেকে তিনমাথা পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণের উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নগর এলাকার বহু স্থাপনা অপসারণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়, যা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। তবে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিরসন এবং নগর চলাচলে স্বস্তি ফিরে আসে, যা শহরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন বগুড়ার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতাল চালু হওয়ার ফলে বগুড়াসহ আশপাশের জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সুবিধা স্থানীয় পর্যায়েই পেতে শুরু করে। পাশাপাশি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আধুনিকায়ন এবং নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে একটি শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে ওঠে। এর ফলে বগুড়া ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তারেক রহমানের দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ উন্নতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ভিত্তি তৈরি করে।
বগুড়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নদীভাঙন রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে এলাকার টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্রীড়া ও নগর উন্নয়নেও বগুড়া পিছিয়ে থাকেনি। শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন বগুড়াকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মানচিত্রে স্থান করে দেয়। একই সঙ্গে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণ এবং হোটেল-মোটেল শিল্পের বিকাশ বগুড়ার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে আরও গতিশীল করে তোলে। এসব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বগুড়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ নগরীতে রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তারেক রহমানের উন্নয়ন দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সরাসরি জনসম্পৃক্ততা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু বিতরণ, চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চেয়েছেন। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিনি যে চিন্তাধারা তুলে ধরেন, তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও পড়ুনদীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই, সমালোচনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হলেও তারেক রহমান তাঁর উন্নয়ন ভাবনা ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। ২০২৬ সালে বগুড়া সফরে তিনি পুনরায় বগুড়াকে একটি আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আধুনিক অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে বগুড়াকে একটি রোল মডেল জেলায় পরিণত করার যে ভিশন তিনি তুলে ধরেন, তা তাঁর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা।
সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, বগুড়ার উন্নয়নে তারেক রহমানের ভূমিকা শুধুমাত্র কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। তৃণমূলের ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে তিনি যে উন্নয়ন মডেল তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বগুড়া যেমন আরও এগিয়ে যাবে, তেমনি দেশের অন্যান্য অঞ্চলও এ থেকে দিকনির্দেশনা পেতে পারে।
লেখক:
আতিকুর রহমান রুমন
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব,
সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক দিনকাল,
আহবায়ক,
আমরা বিএনপি পরিবার ও সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক








