ভিডিও শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩২ দুপুর

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বন্ধ হোক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বন্ধ হোক, ছবি: সংগৃহীত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়ানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মজার ছলে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নামী সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে তৈরি করা হচ্ছে মিথ্যা ও বানোয়াট উক্তি বা খবর। অনেক ব্যবহারকারী, বিশেষ করে যারা প্রযুক্তির অপব্যবহার বা এআইয়ের বিকৃতির ক্ষমতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না, তারা এসব বিষয়কে সত্য মনে করে সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। পরবর্তীতে তারা সেই মিথ্যা তথ্য আবার শেয়ার বা ফরওয়ার্ড করে আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। গুজব বা অপতথ্য প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে কীভাবে গুজবকে শনাক্ত করা যায়। প্রতিটি তথ্যই আমাদের কাছে একটি দায়িত্ব নিয়ে আসে তা সত্য নাকি মিথ্যা, সেটি যাচাই করা। সাধারণত তথ্য তিন ধরনের হয়ে থাকে: মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন এবং ম্যালইনফরমেশন। 

মিসইনফরমেশন হলো এমন তথ্য, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়। যিনি তথ্যটি শেয়ার করছেন, তিনি নিজেই বুঝতে পারেন না যে এটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর। অন্যদিকে, ডিসইনফরমেশন হলো ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য, যার উদ্দেশ্য থাকে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, জনপ্রিয়তা অর্জন করা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিসইনফরমেশনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও বা ফটোকার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন চটকদার তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ম্যালইনফরমেশন। এটি এমন তথ্য, যা আংশিক সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ্যা হলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। কোনো ব্যক্তি বা নেতার নামে বানোয়াট বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে তাকে বিতর্কিত করা এটি ম্যালইনফরমেশনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এমন অপতথ্যের বিস্তার লক্ষ করা গেছে, যা সমাজে বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। 

গুজব কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে না; এটি সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়, মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়, এমনকি কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। আমাদের দেশে একাধিকবার দেখা গেছে, গুজবকে কেন্দ্র করে মব তৈরি হয়ে নিরীহ মানুষকে আক্রমণ করা হয়েছে। ধর্মীয় অপবাদ, ছেলেধরা গুজব কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এসবকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এবং প্রমাণ করে, গুজব কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা। ফ্যাক্ট-চেকিং সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে, বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কোনো তথ্য পাওয়ার পর সেটি যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রিভার্স ইমেজ সার্চ, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই এবং কনটেন্টটি এআই-নির্মিত কিনা এসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব অনেক। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে তা যথাযথভাবে যাচাই করা, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নেওয়া, এবং একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে সংবাদ প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে, যাতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে না পড়ে এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট থাকে।
সর্বোপরি, গুজব প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা। আমরা যদি প্রত্যেকে দায়িত্বশীল আচরণ করি, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করি এবং অন্যদেরও সচেতন করি, তবে এই বিষাক্ত গুজবের বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের সঠিক ব্যবহারই আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এখনই সময় গুজবের বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলার। 

আরও পড়ুন

লেখক :

আফিফা জাহান পুষ্প

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বন্ধ হোক

আবারও মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মার্কিন রণতরি ‘জেরাল্ড ফোর্ড’

ইউটিউব দেখে অকটেন তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে চান না ৪৫ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান

হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করল ইরান

তামিমকে যে কৃতিত্ব দিলেন মাহমুদউল্লাহ