পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয় ও প্রাণের উৎসব
নাসিমা সুলতানা ছুটু : পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার পাতার একটি তারিখ নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও জাতিসত্তার গর্ব। ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল নির্বিশেষে এটি বাঙালির সবচেয়ে সর্বজনীন উৎসব। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে সমাগত বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার পাতায় তারিখ পরিবর্তন নয়, বরং বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তার এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা।
মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত ‘ফসলি সন’ থেকেই আজকের বঙ্গাব্দের সূচনা। সময়ের বিবর্তনে সেই খাজনা আদায়ের দিনটিই আজকের বাঙালির আনন্দ উৎসবে রূপ নিয়েছে। হালখাতা থেকে শুরু করে বৈশাখী মেলা সবই মিশে আছে আমাদের নাড়ির টানে।
বাঙালির এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। যা এবার থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা নামকরণ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই শোভাযাত্রা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু করে ছোট বড় সবজেলাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে মানুষ বর্ণিল মুখোশ, পাখি এবং লোকজ মোটিফ নিয়ে রাজপথে নামে। নারীদের লাল-সাদা শাড়ি আর পুরুষদের পাঞ্জাবিতে পুরো দেশ যেন এক টুকরো লাল-সবুজ পতাকায় পরিণত হয়।
পহেলা বৈশাখের সকাল মানেই ঘরে ঘরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন। যদিও বর্তমান সময়ে ইলিশ সংরক্ষণের খাতিরে এই প্রথায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, তবুও বাঙালির খাবারের রুচিতে দেশীয় আমেজ অমলিন। গ্রামবাংলার মাঠে মাঠে বসে বৈশাখী মেলা। নাগরদোলা, মাটির পুতুল, মুড়ি-মুড়কি আর বাঁশির সুরে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে মুখরিত।
পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হলেও, উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় এই উৎসবের রঙ ও ঢঙ কিছুটা ভিন্ন এবং অনেক বেশি শেকড় সন্ধানী। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ইতিহাস আর আধুনিক জীবনের কোলাহল মিলেমিশে এখানে এক অনন্য বৈশাখী আবেশ তৈরি হয়।
আরও পড়ুনউৎসবের মূলবিন্দু বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা যেন এদিন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পহেলা বৈশাখের ভোরে যখন শহরের প্রধান সড়কে বর্ণিল মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, তখন তাতে ফুটিয়ে তোলা হয় এই অঞ্চলের নিজস্ব কৃষ্টি। লোকজ মেটিফের মুখোশ, মাটির সরা আর ঐতিহ্যবাহী পালকি নিয়ে হাজারো মানুষের এই মিছিলে সামিল হয় ছোট-বড় সবাই। শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এডওয়ার্ড পৌর পার্কের বৈশাখী মেলা। বগুড়া থিয়েটারের আয়োজনে এই মেলা বছরের পর বছর ধরে বগুড়াবাসীকে ঐতিহ্যের নাড়ির টানে ফিরিয়ে আনে। মেলার বিশেষ আকর্ষণ হলো বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম্য খেলাধুলার পুনরুজ্জীবন। মোরগ লড়াই, লাঠিখেলা আর সাপের নাচ দেখতে ভিড় জমায় হাজারো দর্শক, যা এই যান্ত্রিক যুগেও আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মহাস্থানগড়ের ‘শেষ বৈশাখী’র অনন্য মেলা বগুড়ার পহেলা বৈশাখ অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের কথা না বলা হয়। তবে এখানকার উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু কেবল পহেলা বৈশাখ নয়, বরং বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবারের বিশেষ মেলা। হযরত শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার এলাকায় এই ‘শেষ বৈশাখী মেলা’ বা ‘সন্ন্যাসী মেলা’ কয়েকশ বছরের পুরনো। বাউলদের একতারা আর জারি-সারির সুরে মুখরিত এই মেলাটি যেন হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় সংকীর্ণতা ভুলে মানবিক হওয়ার। হিংসা-বিদ্বেষ পেছনে ফেলে মানুষে-মানুষে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করাই এই দিনের মূল সুর। বর্তমানের অস্থির সময়ে বাঙালির এই ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি আমাদের বারবার অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়। পুরানো দিনের গ্লানি ও হতাশা মুছে যাক বৈশাখের রুদ্র তাপে। নতুনের আহ্বানে প্রতিটি প্রাণ জেগে উঠুক সম্ভাবনার নতুন আলোয়।
তাই পহেলা বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার একটি দিন নয়, এটি মূলত পুণ্ড্র সভ্যতার প্রাচীনত্বের সাথে আধুনিক নাগরিক প্রাণের এক নিবিড় সেতুবন্ধন। জীর্ণ পুরাতন ধুয়ে মুছে নতুন বছর নিয়ে আসুক অনাবিল শান্তি এই প্রত্যাশায় লাখো কন্ঠে ধ্বনিত হয়: ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক







_medium_1776104387.jpg)